আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনার প্রস্তুতির মধ্যেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং পাকিস্তানে অবস্থানরত ইরানি প্রতিনিধি দলের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন, ইরান প্রয়োজনে যুদ্ধক্ষেত্রে ‘নতুন কার্ড’ বা কৌশল প্রদর্শনে প্রস্তুত রয়েছে। সোমবার (২০ এপ্রিল) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি মার্কিন নীতির কড়া সমালোচনা করে এই হুঁশিয়ারি প্রদান করেন।
একই দিনে ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, তেহরান ইসলামাবাদের উদ্যোগে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় যোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। বিশেষ করে ইরানের ওপর আরোপিত বন্দর অবরোধ প্রত্যাহারের যে প্রক্রিয়া পাকিস্তান শুরু করেছে, তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে ইরান। তবে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওই কর্মকর্তা স্পষ্ট করেছেন যে, শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ওয়াশিংটনকে দায়ী করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, অবরোধ এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের মাধ্যমে ইরানের ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো ধরনের হুমকির মুখে তেহরান আলোচনায় বসবে না এবং সামরিক ক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণে তারা পিছপা হবে না।
দীর্ঘদিন ধরে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষিতে দুই সপ্তাহের জন্য একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল, যার মেয়াদ আগামী বুধবার (২২ এপ্রিল) শেষ হতে যাচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই মেয়াদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গত রোববার (১৯ এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক একটি ইরানি কার্গো জাহাজ জব্দের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, জাহাজটি আন্তর্জাতিক অবরোধ লঙ্ঘন করে পণ্য পরিবহনের চেষ্টা করছিল। এর জবাবে ইরান পাল্টা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে নিজের অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, একটি সন্তোষজনক চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই অবরোধ প্রত্যাহার করবে না। ট্রাম্প দাবি করেন, তেহরানের সাথে যে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে বর্তমানে আলোচনা চলছে, তা ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর এবং উন্নত হবে।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত ইসলামাবাদে প্রস্তুতির তোড়জোড় দেখা গেলেও মার্কিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সফর নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। রয়টার্সের সূত্রমতে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন, যা পাকিস্তানে তার সম্ভাব্য সফর এবং দ্বিতীয় দফা আলোচনার গুঞ্জনকে নাকচ করে দিয়েছে। এই অনিশ্চয়তা শান্তি প্রক্রিয়াকে দীর্ঘসূত্রিতার দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।
ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে সংঘাত নিরসনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে বন্দর অবরোধ এবং কার্গো জাহাজ জব্দের মতো পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ কূটনৈতিক সমাধানের পথকে সংকীর্ণ করে তুলছে। ইরান যদি সত্যিই তাদের সামরিক কৌশলে কোনো পরিবর্তন বা ‘নতুন কার্ড’ প্রদর্শন করে, তবে তা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বুধবারের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষের দিকে তাকিয়ে আছে, যা পরবর্তী পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।