ক্রীড়া প্রতিবেদক
ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সান্তোস এফসির হয়ে মাঠে নেমে সমর্থকদের সঙ্গে চরম অসন্তোষ ও আচরণগত বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন সুপারস্টার নেইমার জুনিয়র। গত রোববার ভিলা বেলমিরো স্টেডিয়ামে ফ্লুমিনেন্সের বিপক্ষে ম্যাচে হারের পর গ্যালারির দর্শকদের প্রতিক্রিয়ার বিপরীতে নেইমারের অঙ্গভঙ্গি নিয়ে বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলে ব্যাপক সমালোচনা ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন বিশ্বকাপকে সামনে রেখে দলের প্রধান তারকার এমন অস্থির আচরণ ব্রাজিলীয় ফুটবলের নীতিনির্ধারক ও সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ম্যাচ চলাকালীন মাঠের পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। ২-৩ গোলের ব্যবধানে হারের পথে থাকা সান্তোস যখন সমতায় ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে লড়ছিল, তখন নেইমার একটি ‘রেইনবো ফ্লিক’ করার চেষ্টা করেন। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ স্কিল প্রদর্শন সফল না হওয়ায় গ্যালারি থেকে প্রথম দফায় ক্ষোভ প্রকাশ পায়। ম্যাচ শেষে দলের পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার পর দর্শকরা নেইমারকে লক্ষ্য করে তীব্র দুয়োধ্বনি দিতে শুরু করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় নেইমার কানে হাত দিয়ে দর্শকদের উপেক্ষা করার একটি ভঙ্গি প্রদর্শন করে মাঠ ত্যাগ করেন। এই ঘটনার ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে বিতর্কের সূত্রপাত হয়।
সান্তোস এফসির ঘরের মাঠ ভিলা বেলমিরো মূলত নেইমারের বেড়ে ওঠার জায়গা এবং এখান থেকেই তিনি বিশ্ব ফুটবলের পাদপ্রদীপে উঠে এসেছিলেন। সেই পরিচিত আঙিনায় সমর্থকদের এমন রূঢ় আচরণ এবং তার বিপরীতে নেইমারের প্রতিক্রিয়াকে ফুটবল বিশ্লেষকরা পেশাদারিত্বের অভাব হিসেবে দেখছেন। ম্যাচ পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এ নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নেইমার দর্শকদের আচরণের সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, মানুষের সমালোচনা বর্তমানে সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং একজন মানুষের পক্ষে সবসময় এমন চাপ সহ্য করা সম্ভব নয়।
তবে নেইমারের এই ব্যাখ্যায় পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি ঘটেনি। বরং একটি ক্রীড়া বিষয়ক সংবাদমাধ্যমের অনলাইন পোস্টে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি পুনরায় আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত ভিডিওর নিচে নেইমার তার অঙ্গভঙ্গির সপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন, যা পেশাদার ফুটবলারের আচরণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। এর আগেও ভিন্ন এক ম্যাচে সমর্থকদের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়ার নজির থাকায় বিষয়টি এখন ব্যক্তিগত রেষারেষির পর্যায়ে চলে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নেইমারের এই আচরণগত সমস্যা নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে বিশ্বকাপের আগে এমন পরিস্থিতি ব্রাজিলের জাতীয় দলের জন্য কৌশলগত এবং মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। সেলেসাওদের প্রধান ভরসা হিসেবে নেইমারের কাছ থেকে মাঠ ও মাঠের বাইরে সংযত আচরণ প্রত্যাশা করে দেশটির সাধারণ মানুষ। ব্রাজিলের ফুটবলীয় প্রেক্ষাপটে সমর্থকদের সাথে তারকা খেলোয়াড়দের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। সেখানে নেইমারের মতো একজন সিনিয়র খেলোয়াড় যদি সমর্থকদের আবেগকে যথাযথ সম্মান দিতে ব্যর্থ হন, তবে তা মাঠের পারফরম্যান্সেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ক্রীড়া মনোবিদদের মতে, ক্রমাগত ইনজুরি এবং মাঠের বাইরে ব্যক্তিগত জীবনের নানাবিধ চাপ নেইমারের মানসিক স্থিরতাকে ব্যাহত করছে। ফ্লুমিনেন্সের বিপক্ষে পরাজয়ের পর তার দ্রুত মাঠ ত্যাগ এবং কান চেপে ধরার ভঙ্গিটি মূলত সমর্থকদের সাথে দূরত্ব বৃদ্ধিরই বহিঃপ্রকাশ। বর্তমানে সান্তোস এফসি লিগ টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সংগ্রাম করছে, আর ঠিক এমন সময়ে দলের প্রাণভ্রমরার এই খামখেয়ালি আচরণ ক্লাব কর্মকর্তাদেরও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে।
বিশ্বকাপের প্রস্তুতি পর্বে একজন খেলোয়াড়ের শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নেইমারের সাম্প্রতিক এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ফুটবল বিশ্বকে এটাই জানান দিচ্ছে যে, তিনি বর্তমানে চরম মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য নেইমারকে কেবল পায়ের জাদুই নয়, বরং স্নায়ুচাপ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাও প্রমাণ করতে হবে। অন্যথায়, মাঠের বাইরের এই উত্তেজনা ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের স্বপ্ন পূরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত নেইমার কীভাবে এই সংকট কাটিয়ে ওঠেন এবং সমর্থকদের সাথে তার দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের অবসান ঘটে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।