আইন আদালত ডেস্ক
সাবেক ডিজিএফআই মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তারের পর বিএনপি’র সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী গুম সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা তাকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। জিজ্ঞাসাবাদে শেখ মামুন খালেদ ইলিয়াস আলীকে গুম করার প্রক্রিয়া, পরিকল্পনা ও জড়িত কর্মকর্তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শেখ মামুন খালেদ জানিয়েছেন, ইলিয়াস আলী গুম করার সিদ্ধান্ত পূর্বনির্ধারিত ছিল। ইলিয়াস আলী তৎকালীন সময় টিপাইমুখ বাঁধ এবং একটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তির বিরোধিতা করায় সরকারের মনোযোগের কেন্দ্রে আসেন। বিষয়টি ওই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, তার বিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এর বাস্তবায়নের জন্য তৎকালীন ডিজিএফআই ও র্যাবের কর্মকর্তাদের দ্বারা একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছিল। গুমের মিশনটি রেকি ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেন র্যাব-১, আর মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান নেতৃত্ব দেন।
শেখ মামুন খালেদ জানিয়েছেন, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল বনানী থেকে ইলিয়াস আলী ও তার ব্যক্তিগত গাড়িচালককে অপহরণ করা হয়। এ সময় ইলিয়াস আলীকে র্যাব-১ সদর দপ্তরে রাখা হয় এবং সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধর করা হয়। গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অপহরণের পর ১৭ থেকে ২০ এপ্রিলের মধ্যে তাকে হত্যা করে ধলেশ্বরী নদীতে ফেলে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়ায় শেখ মামুন খালেদ উল্লেখ করেছেন, গুমের পুরো প্রক্রিয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয়। ডিজিএফআই এবং র্যাবের কর্মকর্তারা পূর্বে ব্রিফিং প্রাপ্ত ছিলেন। এছাড়া অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষকর্তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। গুমের ঘটনায় জড়িত র্যাব ও ডিজিএফআইয়ের সব সদস্যকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে কেউ দেশত্যাগ করেছেন, কেউ অবসর গ্রহণ করেছেন, এবং কেউ এখনো চাকরিতে আছেন।
ইলিয়াস আলীর পরিবার ও সমর্থকরা দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তার বেঁচে থাকার বিষয়টি জানতে চেয়েছেন। তবে সরকারি কোনো বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি এবং তৎকালীন সরকারের সময়ে কোনো অনুসন্ধান পরিচালনা করা হয়নি বলে পরিবার ও বিএনপি দাবি করেছেন। গণ-অভ্যুত্থানের পর ডিজিএফআইয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বন্দিশালা থেকে অনেক গুমের শিকার মুক্তি পান, কিন্তু ইলিয়াস আলীর কোনো খোঁজ মেলেনি। সর্বশেষ জাতীয় সংসদে তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদী লুনাও স্বামীর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তদন্ত সূত্র জানায়, ঘটনার রাতে ইলিয়াস আলী তৎকালীন শেরাটন হোটেলে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মিটিং করছিলেন। রাত ১১টার দিকে তিনি বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলে তাকে অনুসরণ শুরু করে জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বাধীন গুম স্কোয়াড। মহাখালী থেকে বনানীর ২ নম্বর সড়কে গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভারসহ ইলিয়াস আলীকে অপহরণ করে র্যাব-১ সদর দপ্তরে নেওয়া হয়।
প্রধানত এসব তথ্যের ভিত্তিতে আদালত শেখ মামুন খালেদকে প্রথমে পাঁচ দিনের, পরে ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা তার দেওয়া তথ্য যাচাই বাছাই করে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে ব্যবহার করছেন। ইলিয়াস আলী গুম মামলার তদন্ত এখনো চলমান এবং এই ঘটনায় জড়িত বিভিন্ন কর্মকর্তার অবস্থান ও ভূমিকা নির্ধারণে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।