আইন আদালত ডেস্ক
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, এক-এগারো পরবর্তী সময় এবং সারা দেশে সংঘটিত ক্রসফায়ারের সব ধরনের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত হলে স্বপ্রণোদিতভাবে (সুয়োমোটো) তদন্ত করা হবে। তিনি বলেন, “তদন্তের ভিত্তিতে কারো বিরুদ্ধে যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে ট্রাইব্যুনালে বিচারের সম্মুখীন করা হবে।”
গত মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় চিফ প্রসিকিউটর এ তথ্য জানান। তিনি আরও বলেন, যেসব ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে এবং যেসব বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় মামলা দায়ের হয়েছে, তা যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের বিচারাধীন অপরাধের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে এক-এগারোর সময় যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেগুলোও ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধানে আসবে।
চিফ প্রসিকিউটর নিশ্চিত করেছেন, এক-এগারোর সময় বা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত যেকোনো ব্যক্তিকে তদন্তের মাধ্যমে বিচারের সম্মুখীন করা হবে। তিনি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আফজাল নাছেরকে, যার সঙ্গে এক-এগারোর সময় ঘটানো অপরাধের কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হবে।
এক-এগারো বা ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির ঘটনাবলী নিয়ে ইতিহাসের পটভূমি তুলে ধরে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তখন সেনা হস্তক্ষেপের মাধ্যমে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন। এরপর গঠিত সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এক-এগারো নামে পরিচিত। সেই সময়ের প্রধান কুশীলব হিসেবে পরিচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ২৩ মার্চ গভীর রাতে গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে ২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তার করা হয়। দুজনকেই পৃথক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, সারা দেশে ঘটিত ক্রসফায়ারের মামলার তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে। যাচাই-বাছাই শেষে যেসব ক্রসফায়ারের অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় আসবে, সেগুলো বিচার কার্যক্রমে নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “প্রতিটা ক্রসফায়ারের ঘটনা একটি সাধারণ নকশার অধীনে সংঘটিত, যেখানে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সহযোগিতায় ভুক্তভোগীদের হত্যা করা হয়েছে। এটি একটি সিস্টেমেটিক এবং ব্যাপক মানবতাবিরোধী অপরাধ।”
শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনায় পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল জলিল মণ্ডলকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ হাজির করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং জলিল মণ্ডলের সার্বিক পরিকল্পনায় এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, নিহত ব্যক্তিদের তালিকা প্রায় চূড়ান্ত এবং বিস্তারিত রিপোর্ট ট্রাইব্যুনালের পরবর্তী দিনধার্য অনুযায়ী প্রকাশ করা হবে।
এছাড়া, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে ঘটে যাওয়া মামলাগুলোরও যাচাই-বাছাই করা হবে। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, “সারা দেশে যেসব থানায় মামলা হচ্ছে, সেখানে কোনো দোষী ব্যক্তি ছাড়াই এবং কোনো নিরপরাধ মানুষ অহেতুক জেলে না যায়, তা নিশ্চিত করা হবে।”
একই সময়ে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদল ও জাসাসের নেতাদের হত্যা সংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চার আসামির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা ছিলেন আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনাল নিরপেক্ষভাবে তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনবে এবং নিরপরাধ ব্যক্তিরা অযথা হয়রানির শিকার হবে না।