নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে সারের কোনো সংকট নেই এবং চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ক্ষেত্রবিশেষে বিতরণ প্রক্রিয়ায় কিছু সাময়িক সমস্যা দেখা দিলেও তা নিরসনে সরকার ইতোমধ্যে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন নীতিগত ও উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
দেশের সার্বিক সার পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে উপদেষ্টা জানান, কৃষি উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এবং কৃষকদের যেকোনো ভোগান্তি থেকে মুক্ত রাখতে সরকার আগেভাগেই আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সার আমদানির কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৪ আগস্ট সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে ৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে কানাডা, রাশিয়া ও সৌদি আরব থেকে আরও ১ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন সার ক্রয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে দেশে মোট ১৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সারের সুসংহত মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন, টিএসপি ৩ লাখ ৬৯ হাজার মেট্রিক টন, ডিএপি ৩ লাখ ৬৮ হাজার মেট্রিক টন এবং এমওপি ১ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টন মজুত রয়েছে। এছাড়া বিপুল পরিমাণ সার আমদানির পাইপলাইনে রয়েছে এবং তা পর্যায়ক্রমে দেশে পৌঁছাবে।
মাঠপর্যায়ের বিতরণ ব্যবস্থার অসংগতি প্রসঙ্গে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, কৃষক ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষায় সরকার বিতরণ কাঠামোয় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনছে। নির্ধারিত সময়ে কিছু ডিলার বরাদ্দকৃত সার উত্তোলন না করায় স্থানীয় পর্যায়ে যে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা কঠোর হস্তে দমন করা হচ্ছে। দায়িত্ব অবহেলার দায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক বদলিসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি তুলে ধরে তিনি জানান, আন্তর্জাতিকভাবে পরিবাহিত সারের প্রায় ২৫ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিরাজমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ‘এল নিনো’র মতো প্রতিকূল প্রাকৃতিক প্রভাবের ঝুঁকি মোকাবিলা করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখতে সরকার আগেভাগেই সারের অতিরিক্ত বাফার স্টক বা মজুত গড়ে তুলছে।
জ্বালানি পরিস্থিতির ব্যাখ্যায় উপদেষ্টা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম প্রতি ইউনিট ১২-১৪ ডলার থেকে বেড়ে ২৪ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) কারিগরি দুর্ঘটনার কারণে সাময়িক গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংকট নিরসনে দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে জোর দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ১৫০টি কূপে খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রমের মাধ্যমে দৈনিক ১ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। পাশাপাশি ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে নিয়ে আসার প্রক্রিয়াও দ্রুতগতিতে চলছে। এছাড়া চলমান পরিস্থিতিতে শিল্পকারখানার অর্থনৈতিক সক্ষমতা বজায় রাখতে বকেয়া গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল এককালীন না নিয়ে ১২ মাসের সহজ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে।
ডিজিটাল মাধ্যমে অপপ্রচার প্রতিরোধ সংক্রান্ত বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সাইবার পরিসরে ৪৬৪টি এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীর নামে ১৫৭টি অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর প্রমাণ মিলেছে। আইন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি আইনজীবী প্যানেল গঠন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে শিগগিরই আইনি নোটিশসহ প্রচলিত আইনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর পাশাপাশি তথ্য যাচাই ও গুজবের সত্যতা উন্মোচনে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) ‘বাংলা ফ্যাক্ট’ প্রকল্পকে ‘নিউ মিডিয়া প্রজেক্ট’-এর আওতায় আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধির অংশ হিসেবে চতুর্থ প্রজন্মের মাল্টি-রোল কমব্যাট ফাইটার এয়ারক্রাফট (এমআরসিএ), অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার ও আধুনিক ইউএভি সিস্টেম সংগ্রহের আলোচনা চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা ও শিক্ষা খাতের অগ্রগতি তুলে ধরে উপদেষ্টা জানান, শিক্ষক ও কর্মচারীদের দীর্ঘ চার বছর ধরে আটকে থাকা অবসর ও কল্যাণ ভাতার ২ হাজার ৩৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা সরাসরি ৬৪ জেলার সুবিধাভোগীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা করতে ও নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৪১ লাখ পরিবারের মাঝে সর্বজনীন ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে।
ব্রিফিংয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিভ রহমান, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা এবং প্রধান তথ্য কর্মকর্তা (পিআইও) সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।