বাংলাদেশ ডেস্ক
সংবিধান সংশোধন, আইনি ও বিচারিক সংস্কারসহ দেশের সার্বিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা প্রদানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। সম্প্রতি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজ অফিসকক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিক্সের সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এ আগ্রহের কথা জানানো হয়। বৈঠকে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মানবাধিকার সুরক্ষা, রোহিঙ্গা সংকট এবং তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার রোধসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফয়সল হাসান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়া, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা প্রদান, পুলিশের পেশাগত সামর্থ্য বৃদ্ধি, গুজব ও অপতথ্য প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি বর্তমান সরকারের লক্ষ্য, অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি মনোনীত হওয়ায় অভিনন্দন জানান এবং এই প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় কারিগরি ও বিশেষজ্ঞ সহায়তা প্রদানের প্রস্তাব দেন। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইউএনডিপির দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক সহায়তার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে এই অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান।
রোহিঙ্গা সংকট নিরসন ও ক্যাম্প এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে বিশেষ আলোচনা হয়। বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের জন্য ইউএনডিপির চলমান সহায়তার কথা উল্লেখ করে আবাসিক প্রতিনিধি জানান যে, ক্যাম্প এলাকায় পরিবেশ সুরক্ষা, পাহাড় ধস প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সংস্থাটি কাজ করছে। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, সরকার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্তমান অবকাঠামোর যথোপযুক্ত উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন চায়, তবে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে সেখানে নতুন করে কোনো স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে না।
পুলিশ বাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে বৈঠকে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়। ইউএনডিপি প্রতিনিধি জানান যে, বাংলাদেশ পুলিশের পেশাগত দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ, সংঘাত ও বিরোধ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে এই ধরনের প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। এছাড়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপপ্রচার ও গুজব রোধে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাথে ইউএনডিপির যৌথ কাজের প্রসঙ্গ টেনে সাইবার সুরক্ষা আইনের সফল বাস্তবায়নে লজিস্টিক সহায়তার আহ্বান জানানো হয়।
প্রস্তাবিত মানবাধিকার আইন ও গুম প্রতিরোধ আইন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান যে, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬’-এর খসড়া ইতিমধ্যে মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে এবং জাতীয় সংসদের আসন্ন অধিবেশনে এটি পাস হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অংশীজন, উন্নয়ন অংশীদার, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং আইজীবীদের মতামতের পাশাপাশি দেশের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বর্তমান সরকারের আমলে কোনো ধরনের গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬’-এর খসড়াও মন্ত্রিসভা কর্তৃক নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে।
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সঠিক ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। ইউএনডিপি প্রতিনিধি মন্তব্য করেন যে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে অনেক সময় দেশের প্রকৃত চিত্র সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় না। বাংলাদেশ একটি উদার ও ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ হিসেবে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজেদের ইতিবাচক অবস্থান দৃঢ় করতে পারে এবং ইউএনডিপি এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে আগ্রহী।
উক্ত সৌজন্য সাক্ষাৎকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, রাজনৈতিক-১ অধিশাখার যুগ্মসচিব রেবেকা খান এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড পার্টনারশিপ সাপোর্ট স্পেশালিস্ট সাইফ ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের এই উন্নয়ন সংস্থার মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।