আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান তীব্র আক্রমণ ও নিরাপত্তার চরম ঝুঁকির মধ্যেও ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কিয়েভে জড়ো হয়ে দেশটির প্রতি অটুট সমর্থন অব্যাহত রাখার দ্ব্যর্থহীন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পশ্চিমা মিত্র দেশের শীর্ষ নেতারা। ইউক্রেনকে সর্বাত্মক সহায়তার প্রত্যয় নিয়ে গঠিত ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’-এর প্রায় ৩০ জন নেতার অংশগ্রহণে কিয়েভে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার এবং উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়।
সোমবার কিয়েভে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন ফ্রান্স ও জার্মানির শীর্ষ নেতারা। এছাড়া ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের প্রথম বিদেশ সফরে কিয়েভে উপস্থিত থেকে এই বৈঠকে যোগ দেন ব্রিটিশ সরকারপ্রধান। অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্টও সংহতি প্রকাশ করে কিয়েভে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে পশ্চিমা নেতারা ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিজেদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
সম্প্রতি ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন অঞ্চলে রুশ বাহিনী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব লাগাতার হামলায় রাজধানীর বহু আবাসিক ভবন বিধ্বস্ত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের প্রাণহানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২২ সালে সর্বাত্মক সংঘাত শুরুর পর থেকে বর্তমানে দেশটিতে বেসামরিক লোকজনের হতাহতের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। ইউক্রেনের জরুরি পরিষেবা বিভাগ জানিয়েছে, দেশটির চেরনিহিভ ও ইজিউমসহ বিভিন্ন অঞ্চলে রুশ ড্রোন ও গোলাবর্ষণে বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন।
ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বর্তমান পরিস্থিতির তীব্রতা তুলে ধরে বলেন, সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক হলেও পারস্পরিক ঐক্যই ইউক্রেনকে টিকিয়ে রেখেছে। পরবর্তীতে মিত্র দেশগুলোর নেতাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানান, রুশ আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দিতে ইউক্রেন নিজ দেশেই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বহুগুণ বাড়াতে চায়। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাসম্পন্ন বিশাল অংকের তহবিলের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
পশ্চিমা বৈঠকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, পুতিন প্রশাসনকে এই বার্তা পরিষ্কার করে দিতে হবে যে যুদ্ধক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ করে দখলকৃত কোনো ভূখণ্ড ইউক্রেন কখনো ছেড়ে দেবে না। যেকোনো শান্তি আলোচনা অবশ্যই বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখসারির বাস্তবসম্মত অবস্থান থেকে শুরু করতে হবে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সতর্ক করে বলেন, ইউক্রেনকে সহায়তা প্রদানের কারণে ইউরোপীয় দেশগুলোকে শাস্তি দিতে রাশিয়া সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত করার ষড়যন্ত্র করছে। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ লক্ষ্যবস্তু বানানোর উসকানি ভবিষ্যতে আরও তীব্র হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও সুদৃঢ় করতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে ৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের নতুন সামরিক সহায়তা ছাড় করার ঘোষণা দিয়েছে। পূর্বঘোষিত বৃহৎ ঋণ প্যাকেজের আওতায় এই অর্থ সম্পূর্ণভাবে সামরিক সরঞ্জাম ও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করা হবে। এর আগে কৌশলগত পালটা পদক্ষেপ হিসেবে ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ শাণিত করে। রাশিয়ার প্রভাবশালী ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ওজোনের একাধিক প্রধান গুদামে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। এর জেরে দক্ষিণ রাশিয়ার দুটি বড় গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয় এবং নিরাপত্তার খাটোখাটীতে অন্য স্থাপনাগুলোও দ্রুত খালি করা হয়। সংঘাতের এই বহুমুখী বিস্তার ও দীর্ঘস্থায়ী পরিণতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।