অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের ভোগ্যপণ্য ক্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। ভোজ্যতেল, মসুর ডাল ও চিনির পাশাপাশি রমজান ও অন্যান্য সময়ের চাহিদা মেটাতে ছোলা এবং খেজুরও এই বিশাল সংগ্রহের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতি ও দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার কথা বিবেচনা করে এই পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের এই ক্রয় পরিকল্পনার আওতায় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে মোট ২২ কোটি লিটার ভোজ্যতেল, ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল, ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন চিনি, ১৪ হাজার মেট্রিক টন ছোলা এবং ৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন খেজুর কেনা হবে। প্রাথমিকভাবে সংগৃহীত এসব পণ্যের প্রায় অর্ধেক দেশীয় উৎস থেকে এবং বাকি অর্ধেক আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানির মাধ্যমে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি ও প্রতিযোগিতামূলক দরের ওপর ভিত্তি করে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির পরিমাণ প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ানো বা কমানো হতে পারে।
পণ্যের সুষ্ঠু সরবরাহ ও মজুত ব্যবস্থাপনা জোরদার করার লক্ষ্যে টিসিবি নিয়মিতভাবে মাসভিত্তিক চাহিদা, বরাদ্দ, গুদামে বিদ্যমান মজুত এবং পাইপলাইনে থাকা পণ্যের বহর পর্যবেক্ষণ করছে। বর্তমানে সংস্থাটির দেশজুড়ে মোট ৪০টি গুদাম রয়েছে, যার মধ্যে ৯টি নিজস্ব এবং ৩১টি ভাড়ায় চালিত। এসব গুদামের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৮ হাজার ৩৭০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে নিজস্ব গুদামগুলোর ধারণক্ষমতা ১৩ হাজার ৩৭১ মেট্রিক টন এবং ভাড়ায় নেওয়া গুদামগুলোর ধারণক্ষমতা ৩৪ হাজার ৯৯৯ মেট্রিক টন। ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে মজুত সক্ষমতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটি বর্তমানে বছরে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেল সরবরাহ করে থাকে, যা দেশের মোট ভোজ্যতেলের বাজারের প্রায় ১৫ শতাংশ। তবে পারিবারিক পর্যায়ে এই কার্যক্রমের কার্যকর বাজার অংশীদারত্ব আরও বেশি। ডাল ও চিনির ক্ষেত্রেও সাধারণ পরিবারের চাহিদার একটি বড় অংশ টিসিবির মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়, যা খুচরা বাজারে নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া টিসিবির পণ্যের পরিসর বাড়ানোর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে সাবান, ডিটারজেন্ট ও লবণ বিক্রি শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে এই তালিকায় আটা, বিভিন্ন মশলা, শুকনা মরিচ ও হলুদ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব নতুন পণ্যের ক্ষেত্রে নিয়মিত বাজারদরের চেয়ে কম দামে সরবরাহ করা হলেও এর জন্য কোনো সরকারি ভর্তুকি প্রদান করা হবে না।
সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠার লক্ষ্যে কাজ করছে টিসিবি। প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সংগ্রহ করে তা সামান্য মুনাফায় সাধারণ মানুষের মাঝে বিক্রির মাধ্যমে ভর্তুকির চাপ কমানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বাজারের চাহিদায় আরও দ্রুত সাড়া দিয়ে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সংস্থাটির কার্যকর ভূমিকা আরও সুদৃঢ় হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এদিকে টিসিবির সহায়তা কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল করতে স্মার্ট কার্ড ব্যবস্থার বিস্তার ঘটানো হয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে টিসিবির প্রায় ৮০ লাখ স্মার্ট কার্ড অনুমোদিত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭৫ লাখ কার্ড ইতিমধ্যে উপকারভোগীদের মাঝে বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট কার্ডগুলো আগামী পবিত্র ঈদুল ফিতরের পূর্বেই নির্ধারিত সুবিধাভোগীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জোরালো প্রস্তুতি চলছে। এই ব্যবস্থার ফলে প্রকৃত ও নিম্নআয়ের মানুষ আরও সহজে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে সরকারি সহায়তার সুফল ভোগ করতে পারবেন।