বাংলাদেশ ডেস্ক
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর আবারও সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর এই পদে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটাভুটি হয়েছিল। এরপর গত ৩৫ বছরে আটবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও প্রতিবারই একক প্রার্থী থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার রেওয়াজ তৈরি হয়। তবে সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতির শূন্য আসনে বিরোধী জোট প্রার্থী দেওয়ায় ১৯৯১ সালের মতো আবারও জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট দুপুর দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় জানিয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের আহ্বানে সংসদের অধিবেশন কক্ষে এই বিশেষ নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালিত হবে। ৩৪৯ জন ভোটারের এই নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা নিজ আসনে বসে ব্যালট পেপারে নাম, পূর্ণ স্বাক্ষর ও বিভক্তি সংখ্যা উল্লেখ করে ব্যালট বাক্সে জমা দেবেন।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রথমবার রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তৎকালীন পঞ্চম জাতীয় সংসদে বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ কারও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে আবদুর রহমান বিশ্বাসকে মনোনয়ন দেয়। অন্যদিকে বিরোধী দল আওয়ামী লীগের প্রার্থী হন সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। ওই নির্বাচনে মোট ৩৩০ জন ভোটারের মধ্যে ২৬৪ জন ভোট প্রদান করেন এবং ৬৬ জন সংসদ সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন। ফলাফলে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন এবং বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।
১৯৯১ সালের সেই নির্বাচন ছিল তুমুল রাজনৈতিক নাটকীয়তা ও বিতর্কে ভরপুর। তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আব্দুর রউফ সংসদ কক্ষে স্পিকারের মূল আসনের স্থানে একটি ছোট চেয়ারে বসে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। ভোটগ্রহণের জন্য অধিবেশন কক্ষের ভেতরেই চারটি বুথ বসানো হয়েছিল। নির্বাচনে পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের বিবরণ অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভোটদানের মাধ্যমে দুপুর দুইটায় ভোট শুরু হয়। তবে ভোটগ্রহণ শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত হয়ে উন্মুক্ত ও প্রকাশ্য ভোটগ্রহণের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান থাকলেও ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে প্রকাশ্য ভোটের বিধান চালু করা হয়। ওই নির্বাচনে পোলিং অফিসার ও এজেন্টদের উপস্থিতিতে ব্যালট পেপারে স্বাক্ষর দিয়ে প্রকাশ্যেই ভোট দিতে হয়েছিল। তৎকালীন বিরোধী দল এই পদ্ধতির বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রপতির আইনকে কলুষিত করার’ অভিযোগ এনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। যদিও রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের সমর্থনসহ ১৭২ ভোট পেয়ে আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন হন।
৩৫ বছর পর অনুষ্ঠেয় আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারও সামনে এসেছে প্রকাশ্য ভোটদান ও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আইনি বাস্তবতা। সংবিধানে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বাধ্যবাধকতা থাকায় প্রকাশ্য ভোটের ক্ষেত্রে ক্রস-ভোটিং বা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনজ্ঞ মহলে মতভেদ রয়েছে।
সংসদ গবেষকদের একাংশের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জাতীয় সংসদের কোনো নিয়মিত আইন প্রণয়ন কার্যক্রম বা সাধারণ কার্যপ্রণালীর অংশ নয়, বরং এটি বিশেষ সাংবিধানিক আইন দ্বারা পরিচালিত। ফলে এই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর হবে না। বিপরীতে নির্বাচন কমিশন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অন্য অংশের মতে, সংসদ কক্ষের ভেতরে প্রকাশ্য ভোটে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যকে সদস্যপদ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে হবে।
দলীয় অবস্থানের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হতে যাওয়া এই ভোটকে কেন্দ্র করে সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটগ্রহণ, ব্যালট গণনা এবং ফলাফল ঘোষণার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হবে। ১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক সেই নির্বাচনের মতোই সংসদের ভেতরে ব্যালট বাক্স স্থাপন ও সরাসরি ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি।