জাতীয় ডেস্ক
প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভরতার চিরাচরিত ধারা থেকে বেরিয়ে খেলাধুলা ও আনন্দময় কার্যক্রমের মাধ্যমে পাঠদানের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। শিশুদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তনক্ষমতা (ক্রিটিক্যাল থিংকিং) এবং সমস্যা সমাধানের বাস্তবিক দক্ষতা গড়ে তুলতে খেলাভিত্তিক শিখন পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই লক্ষ্য অর্জনে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামো ও সামগ্রিক পরিবেশ সেই অনুযায়ী গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত তথ্যপুস্তক পর্যালোচনা বিষয়ক ‘খেলায় খেলায় শিখি’ শীর্ষক এক জাতীয় কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা তুলে ধরেন। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) এবং সহযোগী উন্নয়ন সংস্থার যৌথ উদ্যোগে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
কর্মশালায় প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিশুদের মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের তৃণমূল পর্যায়ের স্থানীয় খেলা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ করেছে। গবেষণার অংশ হিসেবে মাঠপর্যায় থেকে সংগৃহীত চার শতাধিক খেলাকে শ্রেণিকক্ষ ও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে চর্চার উপযোগী হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর বাইরেও স্থানীয় পর্যায়ে প্রচলিত সাত শতাধিক লোকজ ও প্রচলিত খেলাকে কাঠামোগত নিয়মের আওতায় এনে প্রাথমিক পাঠ্যক্রমে কীভাবে কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা নিয়ে বিশদ কাজ এগিয়ে চলছে।
আনন্দদায়ক শিখন পরিবেশের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে ববি হাজ্জাজ বলেন, কেবল তথ্য মুখস্থ করানোর মাধ্যমে শিশুদের প্রকৃত শিখন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রাথমিক স্তর থেকেই যদি শিশুরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আনন্দের মধ্য দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, তবে তাদের মেধার বিকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাশক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। তিনি বিশ্ব প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে চীন ও জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বলেন, সেসব দেশে পাঠ্যক্রমের প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে বিশেষ খেলনা ও খেলার চমৎকার সমন্বয় সাধন করা হয়েছে। কোন শ্রেণিতে, কোন বিষয়ের কোন অধ্যায় পড়াতে কী ধরনের খেলনা বা খেলা প্রয়োগ করা হবে, তা পাঠ্যবইয়ে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। এই কার্যক্রমে পাঠ্যপুস্তক প্রকাশক, খেলনা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও পাঠ্যক্রম প্রণেতারা একযোগে কাজ করেন।
বাংলাদেশেও এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা চলছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সঙ্গে এ বিষয়ে ইতোমধ্যে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। খুব শিগগিরই সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক ও পাঠ্যপুস্তক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসে প্রাথমিক শিক্ষায় খেলনা ও খেলাভিত্তিক শিখন পদ্ধতি চূড়ান্তভাবে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণ, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ ও খেলার মাঠ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী করতে প্রাথমিক স্তর থেকেই শিখন প্রক্রিয়ায় গুণগত পরিবর্তন আনা জরুরি। শিশুদের শৈশবকে পাঠ্যবইয়ের অতিরিক্ত চাপ থেকে মুক্ত করে একটি সহযোগিতামূলক ও সৃষ্টিশীল পরিবেশ উপহার দেওয়াই সরকারের মূল লক্ষ্য।
জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) মহাপরিচালক ফরিদ আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় আরও বক্তব্য দেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী এবং সেভ দ্য চিলড্রেনের কান্ট্রি ডিরেক্টর সুমন সেনগুপ্ত। বক্তারা প্রাথমিক স্তরে আনন্দদায়ক পাঠদানের নীতি দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।