বিশেষ প্রতিবেদক
সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, তিনি ইতোমধ্যে পদত্যাগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে যাচ্ছেন এবং রাষ্ট্রপতির কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পেশ করবেন। এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম বিষয়টি সরাসরি নাকচ করেননি। তিনি ইঙ্গিতপূর্ণভাবে জানান, কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত রূপ পেলে তা দাপ্তরিক নিয়মেই সংশ্লিষ্ট মহল জানতে পারবে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের অক্টোবরে অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমকে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তৎকালীন পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে পিএসসির তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন এবং কমিশনের ১২ জন সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেন। সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটাতে এবং সিভিল সার্ভিস নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংস্কার আনার লক্ষ্যে সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট গবেষক মোবাশ্বের মোনেমকে কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করেছিল।
সংবিধানের ১৩৭ থেকে ১৪১ অনুচ্ছেদের আলোকে গঠিত বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। মোবাশ্বের মোনেমের নেতৃত্বে নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর বিসিএস পরীক্ষার জট নিরসন, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগমুক্ত স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং মৌখিক পরীক্ষার নিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণে বেশ কিছু কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে বিগত বছরগুলোতে নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে তৈরি হওয়া দীর্ঘসূত্রতা নিরসনে পিএসসি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করছিল।
প্রশাসনিক ও কমিশন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের নীতিগত জটিলতা তৈরি হয়। এছাড়া চলমান বিসিএস পরীক্ষাগুলোর সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ, বিগত সময়ে স্থগিত হওয়া মৌখিক পরীক্ষাগুলো পুনর্বিন্যাস এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের স্বার্থে নীতিমালায় পরিবর্তনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। তবে দায়িত্ব গ্রহণের তুলনামূলক স্বল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর এই পদত্যাগের সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যক্তিগত কারণ নাকি প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পটভূমি রয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট করা হয়নি।
সংবিধান অনুযায়ী, পিএসসির চেয়ারম্যান কিংবা কোনো সদস্য তাঁদের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে চাইলে মহামান্য রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে নিজ স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগপত্র দাখিল করতে পারেন। পদত্যাগপত্রটি রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত হওয়ার পর তা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয় এবং এ সংক্রান্ত গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এরপর শূন্য পদ পূরণের জন্য সাংবিধানিক নিয়ম মেনে সরকার নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রক্রিয়া গ্রহণ করে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা ও বিসিএস ক্যাডার নিয়োগের দায়িত্বে থাকা এই শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ নেতৃত্বের এমন পরিবর্তন চলমান নিয়োগ কার্যক্রমে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যেসব বিসিএস পরীক্ষার ফলাফল ও ভাইভার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, সেগুলো সুষ্ঠু ও দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কমিশনের পরবর্তী নেতৃত্বের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পিএসসির শীর্ষ প্রশাসনে পুনরায় একটি নতুন রদবদলের আবহ সৃষ্টি হলো, যা সিভিল সার্ভিসের সার্বিক নিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও চলমান সংস্কার কার্যক্রমের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।