শিক্ষা ডেস্ক
চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য দেশজুড়ে ১৩ লক্ষাধিক আবেদন জমা পড়েছে। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে একযোগে জমা পড়া এই বিপুলসংখ্যক আবেদন সামাল দিতে গিয়ে প্রশাসনিক জটিলতা ও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে কর্তৃপক্ষ। এ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত পরিবর্তন এনে একটি সুনির্দিষ্ট ও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ডের সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের পর নির্ধারিত সময়ে ১৩ লাখের বেশি উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়েছে। গত ১১ আগস্ট থেকে অনলাইনে এ আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ১৭ আগস্ট দিবাগত রাত ১২টায় তা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। স্বল্প সময়ের মধ্যে এত বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়ার ঘটনা অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ফল পুনর্নিরীক্ষণ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষকদের দ্বারা উত্তরপত্র নতুন করে মূল্যায়ন বা প্রতিটি উত্তরের মান যাচাই করা হয় না। মূলত চারটি সুনির্দিষ্ট দিক যাচাই করে ফলাফল পুনর্নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—উত্তরপত্রের সব প্রশ্নের বিপরীতে নম্বর সঠিকভাবে দেওয়া হয়েছে কি না, প্রাপ্ত নম্বরগুলোর যোগফলে কোনো ভুল রয়েছে কি না, ভেতরের প্রাপ্ত নম্বর মূল কভার পৃষ্ঠা বা ওএমআর শিটে সঠিকভাবে স্থানান্তর করা হয়েছে কি না এবং ওএমআর শিটে সেই নম্বর অনুযায়ী বৃত্ত পূরণ নির্ভুলভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না। এই চার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গাণিতিক বা করণিক ত্রুটি চিহ্নিত হলে তা সংশোধন করে সংশোধিত ফল প্রকাশ করা হয়ে থাকে।
তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাপ্ত নম্বরের ব্যবধান বৃদ্ধি ও উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার প্রবণতা থেকে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনের সংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সর্বোচ্চ গ্রেড পয়েন্ট (জিপিএ-৫) বা শতভাগ নম্বর পাওয়ার কাছাকাছি থাকা শিক্ষার্থীরাও সামান্য নম্বরের পার্থক্যের আশায় আবেদন করছে। বিপুল এই উত্তরপত্র যাচাই করতে গিয়ে বোর্ডগুলোর নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ে উচ্চমাধ্যমিকের ভর্তি কার্যক্রম শুরু করাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, বর্তমান বাস্তবতায় প্রায় সব শ্রেণির শিক্ষার্থীর মধ্যেই খাতা পুনর্মূল্যায়নের একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এমনকি জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন এ-প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীরাও বাড়তি নম্বরের আশায় আবেদন করছে, যা উত্তরপত্র যাচাই প্রক্রিয়ার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। কারণ ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষার নানা পর্যায়ে প্রতিটি বিষয়ের ব্যক্তিগত নম্বর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিক্ষামন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, এত বিপুলসংখ্যক উত্তরপত্র স্বল্প সময়ের মধ্যে যাচাই-বাছাই করা অত্যন্ত দুরূহ ও জটিল একটি কাজ। ফলে পুরো মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে আরও শৃঙ্খলিত ও কার্যকর করতে সরকার একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রস্তাবিত নীতিমালায় কারা ফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করার যোগ্য বিবেচিত হবে এবং কোন ধরনের উত্তরপত্র এই প্রক্রিয়ার আওতায় আসবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন ভিত্তিহীন ও অপ্রয়োজনীয় আবেদনের সংখ্যা হ্রাস পাবে, অন্যদিকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত বা করণিক ত্রুটির শিকার হওয়া শিক্ষার্থীরা দ্রুততম সময়ে তাদের সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে পারবে। একই সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রশাসনিক চাপ কমিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্ভুল ফল ও ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে।