রাজনীতি ডেস্ক
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর জাতীয় সংসদে ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দেশ। আসন্ন ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বিরোধী রাজনৈতিক জোটের মুখোমুখি অবস্থানের মধ্য দিয়ে পুনরায় বহুদলীয় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফিরে আসছে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক ধারাকে সুসংহত করতে এবং নির্বাচনে সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংস্কৃতি বজায় রাখতেই বিরোধী জোট থেকে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জোটের শীর্ষ নেতারা।
আসন্ন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও প্রবীণ রাজনীতিক কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। এর আগে ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদে সর্বশেষ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির আব্দুর রহমান বিশ্বাস এবং বিরোধী দলগুলোর মনোনীত প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকা সত্ত্বেও কেন শীর্ষ সাংবিধানিক পদে প্রার্থী দেওয়া হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে বিরোধী জোটের নেতারা স্পষ্ট করেছেন যে, তাদের প্রধান লক্ষ্য জয়-পরাজয়ের সংকীর্ণ হিসাব নয়। বরং সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চাকে অর্থবহ করা এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের সংস্কৃতির অবসান ঘটানোই এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য। জোটের মতে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হওয়ার চেয়ে একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া জাতীয় স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে অধিক সংগতিপূর্ণ।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার জানান, একক দলের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে না। রাষ্ট্রপ্রধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনই রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে তাঁর ভূমিকাকে আরও দৃঢ় করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিরোধী ১১ দলীয় জোটের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি বিবেচনা করেই কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে মনোনীত করা হয়েছে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে তাঁর আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানান, বিরোধী দলের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও রাজনৈতিক স্বকীয়তা বজায় রাখার স্বার্থেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক চর্চাকে জনগণের সামনে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করাই তাদের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট দলীয় গণ্ডি ও মতাদর্শের বাইরে গিয়ে দেশকে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা থেকেই একজন সর্বজনগ্রাহ্য প্রবীণ রাজনীতিককে রাষ্ট্রপ্রধানের পদে প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দেওয়া হয়েছে। এটি ভবিষ্যতে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যেরই একটি বহিঃপ্রকাশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর সংসদে একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই প্রক্রিয়া দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। শুধু পদ পাওয়ার জন্য নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রকে কার্যকর করার যে তাগিদ বিরোধী জোট দেখিয়েছে, তা সংসদীয় চর্চাকে আরও গতিশীল করবে।
এদিকে, আসন্ন এই নির্বাচনকে ঘিরে ‘জুলাই সনদ’-এর আলোকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোটদান প্রক্রিয়াকে দলীয় নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবমুক্ত রাখার দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতারা। তাদের মতে, সংসদ সদস্যরা যদি স্বাধীনভাবে বিবেক অনুযায়ী ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে।