আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে সোমবার সকালে ৭.৪ মাত্রার এক শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ভূমিকম্পে আড়াই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ধসে পড়া অসংখ্য ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু মানুষ আটকা পড়ে থাকায় নিহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে শত শত মানুষ আহত হয়েছেন এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও অনেকে।
দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের বরাতে জানা গেছে, ভূমিকম্পটির তীব্রতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ৬১টি ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে এবং দেড় হাজারের বেশি বাড়িঘর ও প্রশাসনিক কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় পার্বত্য শহর পেরেইরা। কেবল এই শহরটিতেই শতাধিক মানুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে দেশটির অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ শহর কালিতে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দেশটির সরকার জরুরি ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে অবিলম্বে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা করেছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর তথ্যমতে, শক্তিশালী এই ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল রাজধানী বোগোটা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত চোকো প্রদেশের সান হোসে দেল পালমার এলাকায়, ভূপৃষ্ঠের ১০৭ কিলোমিটার গভীরে। মূল ভূকম্পনের পর পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ওই অঞ্চলে ২১টিরও বেশি আফটারশক বা অনুকম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। কম্পন এতটাই তীব্র ছিল যে তা প্রতিবেশী দেশ ইকুয়েডর ও পানামা পর্যন্ত অনুভূত হয়।
সম্প্রতি শপথ গ্রহণ করা কলম্বিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট অ্যাবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েল্লা ইতোমধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত চোকো প্রদেশ ও ক্ষতিগ্রস্ত নগরীগুলো সফর করেছেন। প্রেসিডেন্ট জরুরি দুর্যোগ তহবিল থেকে দুর্গতদের জন্য বিপুল অঙ্কের সহায়তা বাজেট অনুমোদন করেছেন। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত উদ্ধার, চিকিৎসা প্রদান ও নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়াকেই সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কফি উৎপাদনকারী দেশ কলম্বিয়ায় এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর উদ্ধারকাজে সরকারি দুর্যোগ মোকাবিলা সংস্থা ও ফায়ার সার্ভিস দলের পাশাপাশি জাতীয় কফি উৎপাদনকারী ফেডারেশনের স্বেচ্ছাসেবীরাও মাঠে নেমেছেন। ধসে পড়া ভবনগুলোর ইট-পাথর ও কংক্রিটের স্তূপ সরাতে ভারী যন্ত্রপাতির পাশাপাশি ম্যানুয়ালি কাজ করে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। বিমানবন্দরগুলোর রানওয়ে ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং ভূমিধসে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় অনেক দুর্গম এলাকায় জরুরি ত্রাণ পৌঁছাতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।
ভূমিকম্পের সার্বিক প্রভাবে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালিতে মানবিক সংকট ঘনীভূত হয়েছে। শহরের স্বাস্থ্য প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে, মৃতদেহের চাপ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় প্রধান মর্গের ধারণক্ষমতা অতিক্রম করে গেছে। হাসপাতালগুলোতে আহতের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় এবং পরবর্তী আফটারশকের আশঙ্কায় হাজার হাজার আতঙ্কিত মানুষ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক বাস্তুহারা অধিবাসী সড়ক ও ফুটপাতে অবস্থান নিয়ে ধ্বংসস্তূপে নিজেদের সামান্য সম্বল ও স্বজনদের খোঁজে আকুল সন্ধান চালাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, দুর্যোগ কবলিত অঞ্চলগুলোতে অবিলম্বে ওষুধ, সুপেয় পানি ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের সংস্থান না করা গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিতে পারে।