অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দেশের অন্যতম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) আংশিক চালু হয়েছে। টার্মিনালটির দুটি বয়লারের মধ্যে একটি সচল হওয়ার পর থেকেই জাতীয় গ্রিডে আবারও গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাস সংকট নিরসনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এই এফএসআরইউ টার্মিনালে হঠাৎ করে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। এই ত্রুটির কারণে টার্মিনালটির স্বাভাবিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে দেশজুড়ে বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে। টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের জোগান আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পায় এবং শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও গৃহস্থালি খাতে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেয়। সংকট মোকাবিলায় জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশি ও বিদেশি প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে গঠিত কারিগরি দল টার্মিনালটি মেরামতের জন্য নিরলসভাবে কাজ শুরু করে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর অবশেষে টার্মিনালের দুটি বয়লারের মধ্যে একটি সচল করা সম্ভব হয়। বয়লার চালুর ফলে মহেশখালীর এই টার্মিনাল থেকে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. সালাহউদ্দিন জানান, এফএসআরইউ টার্মিনালে ঘটা দুর্ঘটনা এবং ত্রুটি সারাতে দেশি ও বিদেশি প্রকৌশলীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তাদের প্রচেষ্টায় পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। টার্মিনালের দুটি বয়লারের একটি চালু হওয়ার ফলে বর্তমানে ২০০ থেকে ২৫০ এমএমসিএফটি (মিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। যদিও টার্মিনালটির পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী ৪৫০ এমএমসিএফটি গ্যাসের জোগান এই মুহূর্তে পুরোপুরি চালু হয়নি, তবে আংশিক এই সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বর্তমানে পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা চলছে। আনোয়ারা পয়েন্ট থেকে গ্যাস গ্রহণ করে বর্তমানে প্রায় ২০০ এমএমসিএফটি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে এই অঞ্চলে গ্যাসের সরবরাহ ২৬০ থেকে ২৭০ এমএমসিএফটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে বর্তমান সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে।
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামো। আমদানিকৃত তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন বা প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এই টার্মিনালগুলোর ওপর বাংলাদেশ বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের জন্য এই টার্মিনালের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপর বয়লারটি সম্পূর্ণ মেরামত করে টার্মিনালটির পূর্ণক্ষমতা ফিরিয়ে আনা না গেলে জ্বালানি খাতের সামগ্রিক ঝুঁকি পুরোপুরি কাটবে না। তবে বর্তমানে আংশিক চালুর ফলে শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল, তা দ্রুত কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাকি ত্রুটিগুলো দ্রুত সারিয়ে তোলার জন্য প্রকৌশলীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং খুব শীঘ্রই টার্মিনালটি তার পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতায় ফিরবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।