আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ লেবাননে শনিবার ভোরে ইসরায়েলি বাহিনীর তীব্র বিমান হামলায় অন্তত সাতজন নিহত এবং আরও তিনজন আহত হয়েছেন। হামলার পর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ব্যাপক উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হচ্ছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের সন্ধানে তল্লাশি অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক কার্গো জাহাজে অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতের ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক ও নৌ-নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন করে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় তথ্যমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, শনিবার ভোরে দক্ষিণ লেবাননের একটি জনবহুল এলাকা লক্ষ্য করে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। আকস্মিক এই হামলায় কয়েকটি আবাসিক ভবন ধসে পড়ে এবং আশপাশের অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনার পরপরই স্থানীয় জরুরি পরিষেবা ও প্যারামেডিক দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। ধসে পড়া ভবনের নিচ থেকে বেশ কয়েকজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ধ্বংসস্তূপ পুরোপুরি অপসারণ না করা পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি ও নিহতের চূড়ান্ত সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষ।
সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত ২৬ জুন লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি সমঝোতামূলক ‘কাঠামো চুক্তি’ ঘোষণার পর এটিই অন্যতম প্রাণঘাতী সামরিক আগ্রাসন। ওই চুক্তিতে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার শর্তে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পর্যায়ক্রমিক প্রত্যাহারের একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে চুক্তি ঘোষণার পরও সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি, বরং উভয় পক্ষের মধ্যে অনাস্থা এবং দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বারবার বিঘ্নিত হচ্ছে। আজকের এই প্রাণঘাতী হামলার ফলে বিদ্যমান ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়া আরও বড় ধরনের ধাক্কা খেল বলে মনে করা হচ্ছে।
লেবানন ভূখণ্ডে হামলার পাশাপাশি পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলসীমাতেও নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের সমুদ্র নিরাপত্তা নজরদারি সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, শুক্রবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় একটি বাল্ক কার্গো জাহাজে অজ্ঞাত একটি বস্তু আঘাত হানে। বস্তুটি সরাসরি বাণিজ্যিক জাহাজটির মূল কাঠামোতে আঘাত করলে সেখানে ক্ষতির সৃষ্টি হয়। তবে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জাহাজে কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটেনি এবং জাহাজে অবস্থানরত সকল নাবিক ও ক্রু সদস্য নিরাপদে রয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। হামলার প্রকৃত উৎস এবং ব্যবহৃত বস্তুর ধরন শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর রুট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৈশ্বিক অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর যেকোনো আঘাত বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
লেবাননে বিমান হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাতের ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা না হলেও, সার্বিক ঘটনাপ্রবাহ মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে এক জটিল সমীকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে আসছে। লেবানন সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা এবং নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।