অর্থনীতি প্রতিবেদক
পাইলট প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের পর আগামী ১৬ আগস্ট দেশের বহুল আলোচিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। প্রথম ধাপে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার লতিফাবাদ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে প্রধানমন্ত্রী এই কর্মসূচিটির উদ্বোধন করবেন। আগামী চার বছরের মধ্যে দেশের প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ফ্যামিলি কার্ড-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভা শেষে এসব তথ্য জানানো হয়। সভা শেষে বিস্তারিত তুলে ধরেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশের প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তার সুষম বণ্টন করার লক্ষ্যেই এই যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সভায় জানানো হয়, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে একটি ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ বা গতিশীল সামাজিক নিবন্ধনের আওতায় পরিচালনা করা হবে। এর ফলে মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সুবিধাভোগীদের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা সম্ভব হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—প্রকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কেউ যেন তালিকা থেকে বাদ না পড়েন এবং পাশাপাশি অযোগ্য কোনো ব্যক্তি যেন তালিকাভুক্ত হতে না পারেন, তা নিশ্চিত করা।
সরকার জানিয়েছে, ইউনিয়ন পর্যায়ে সূক্ষ্ম তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমেই কেবল প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হবে। অতীতে বিভিন্ন ভাতা ও ত্রাণ বিতরণে যে ধরনের দুর্বলতা বা অনিয়ম দেখা গিয়েছিল, তা কঠোরভাবে দূর করতেই সরকার নিয়মিত তথ্য সংশোধন ও পর্যালোচনার এই আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। একজন মানুষ সময়ের ব্যবধানে দরিদ্র থেকে নিম্নবিত্ত, নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত কিংবা এর বিপরীত পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন। এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই কর্মসূচিটিতে কোনো স্থির বা অপরিবর্তিত তালিকা রাখা হয়নি, বরং এটি সম্পূর্ণ পরিবর্তনশীল তথ্যভিত্তিক একটি ব্যবস্থা।
কর্তৃপক্ষ আরও স্পষ্ট করেছে যে, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে এই সুবিধার আওতায় আনা বা বঞ্চিত করার কোনো সুযোগ থাকবে না। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের সার্বিক নীতির অংশ হিসেবেই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী ১৬ আগস্ট উদ্বোধনের পর চলতি বছরের অক্টোবরের শেষ নাগাদ পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়নে তথ্য সংগ্রহ ও এর কার্যক্রম শুরু হবে। তবে একসাথে পুরো দেশজুড়ে বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে এটি সম্প্রসারণ করা হবে। প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে চার বছরের মধ্যে ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে এর অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা থাকলেও তথ্য সংগ্রহ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে এই সংখ্যা পরবর্তীতে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
নারী সমাজের ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করতে সহায়তার এই অর্থ পরিবারের নারীদের মাধ্যমেই পরিচালনা করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবারের নারী সদস্যরা এই অর্থ শিশুদের শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, হাঁস-মুরগি পালন, গাছ লাগানো, কুটিরশিল্প, সেলাই এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রমে ব্যয় করতে পারবেন। এটি একদিকে যেমন নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে সামগ্রিক দারিদ্র্য বিমোচনে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।
এর আগে দেশের ৫৬টি এলাকায় পরীক্ষামূলক বা পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এই কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছিল। এর মধ্যে যশোর ও নেত্রকোনার দুটি এলাকার তথ্য সংগ্রহে কিছু যান্ত্রিক ও পদ্ধতিগত সমস্যা দেখা দিলেও পরবর্তীতে তা সফলভাবে সংশোধন করা হয়েছে। বাকি ৫৪টি এলাকায় বড় ধরনের কোনো সমস্যা দেখা যায়নি এবং সেখানে ত্রুটির হার ছিল ৩ শতাংশের নিচে। আগামী ১৬ আগস্ট থেকে নতুন প্রশ্নমালা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ অনলাইনে এই তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হবে। বাস্তবায়নের যে কোনো পর্যায়ে নতুন কোনো ত্রুটি বা সমস্যা ধরা পড়লে তা দ্রুত নিরসনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কর্মসূচির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে একটি শক্তিশালী তিন স্তরের তদারকি বা মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন সম্পূর্ণভাবে সরকারি কর্মকর্তারা এবং এই প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা প্রভাবশালীদের যুক্ত থাকার সুযোগ রাখা হয়নি। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে, জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে এবং বিভাগীয় পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনারের তত্ত্বাবধানে পৃথক পৃথক কমিটি কাজ করবে। পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও একটি উচ্চপর্যায়ের তদারকি কমিটি সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করবে।
সরকার প্রধান নিজে নিয়মিত এই কর্মসূচির সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করছেন এবং সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করে চলেছেন। একই সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং অর্থ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে তথ্য যাচাই করে এটি নিশ্চিত করবে যেন কোনো ব্যক্তি দ্বৈত সুবিধার আওতায় একাধিক ভাতা বা সহায়তা গ্রহণ করতে না পারেন। প্রথম পর্যায়ে সারা দেশের তথ্য সংগ্রহ সম্পন্ন হওয়ার পর প্রতি মাসেই তা নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। এর ফলে মৃত্যুজনিত কারণে কিংবা আর্থসামাজিক অবস্থার যেকোনো পরিবর্তনের সঠিক তথ্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
এই কর্মসূচির নীতিমালা, প্রশ্নপত্র, যোগ্যতা ও অযোগ্যতার মানদণ্ডসহ যাবতীয় তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য অনলাইনে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি এই কর্মসূচির প্রকৃত সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নের জন্য অর্থ বিভাগ, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে স্বাধীন গবেষণা পরিচালনা করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মসূচির সুদূরপ্রসারী কার্যকারিতা সঠিকভাবে মূল্যায়নের জন্য অন্তত ছয় মাস সময় প্রয়োজন। সামগ্রিক এই প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমের ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। কর্মসূচির কোথাও কোনো ধরনের অনিয়ম, ত্রুটি বা দুর্বলতা দেখা দিলে তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর সরকার তা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।