নিজস্ব প্রতিবেদক
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার ইকামাতেদ্বীন মডেল কামিল মাদ্রাসার ১৯ জন জনবল কাঠামোর (প্যাটার্ন) বহির্ভূত শিক্ষক ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিধিবহির্ভূতভাবে ১ কোটি ৪৪ লাখ ৪৮ টাকা অতিরিক্ত এমপিও সুবিধা হিসেবে গ্রহণের তীব্র অভিযোগ উঠে এসেছে। এ ঘটনায় মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর সংশ্লিষ্টদের আগামী এক মাসের মধ্যে উত্তোলিত সমুদয় অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উত্তোলিত অর্থ ফেরতে ব্যর্থ হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি আইনের আওতায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মামলা দায়েরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীন বেসরকারি মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও পুনর্বিবেচনা, গ্রেড পরিবর্তন, বাতিল ও স্থগিতকরণ সংক্রান্ত কমিটির সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। উক্ত কমিটির গত ১৬ জুনের সিদ্ধান্তের আলোকে গত ১৬ জুলাই মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে এমপিও বাছাই ও অনুমোদন কমিটির নিয়মিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বিশদ পর্যালোচনার পর ভাঙ্গা উপজেলার ইকামাতেদ্বীন মডেল কামিল মাদ্রাসার (যাহা মূলতঃ আলিম স্তর পর্যন্ত এমপিওভুক্ত) ফাজিল ও কামিল স্তরের ১৯ জন প্যাটার্ন বহির্ভূত শিক্ষক-কর্মচারীর ইনডেক্স কর্তনের পাশাপাশি তাদের নামে অবৈধভাবে উত্তোলিত সমুদয় অর্থ সরকারি চালানের মাধ্যমে চালানের মূল কপি অথবা সত্যায়িত অনুলিপি অধিদপ্তর বরাবর জমা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য এবং দাফতরিক নথি অনুযায়ী, প্যাটার্ন বহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত এমপিও ভোগকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের তালিকা ও অর্থ উত্তোলনের সুনির্দিষ্ট বিবরণ তুলে ধরা হলো:
প্রভাষক (আরবি) মো. আল আমিন: ৭ লাখ ৫১ হাজার ২৪২ টাকা
প্রভাষক (আরবি) মো. রাশেদুল ইসলাম: ১০ লাখ ৬০ হাজার ৩০২ টাকা
প্রভাষক (বাংলা) মো. কুদরাতুর রহমান: ১৮ লাখ ১ হাজার ১০২ টাকা
প্রভাষক (ইংরেজি) ফকরুল ইসলাম: ১৮ লাখ ১ হাজার ১০২ টাকা
প্রভাষক (ইসলামের ইতিহাস) মো. ফারুক হোসেন: ২১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৪১ টাকা
প্রভাষক (গ্রন্থাগারিক) মো. সরোয়ার হোসেন: ৭ লাখ ৫১ হাজার ২৪২ টাকা
সহকারী গ্রন্থাগারিক মহিউদ্দিন: ৮ লাখ ৭৭ হাজার ১৫ টাকা
সহকারী মৌলভী মো. নূরনবী: ৬ লাখ ২৭ হাজার ৭০২ টাকা
জুনিয়র শিক্ষক নাছরিন: ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৪৫৩ টাকা
অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর কাজী আল মাসুদ: ৪ লাখ ৮১ হাজার ১৮৩ টাকা
ল্যাব সহকারী (পদার্থ) মো. রেজাউল মিয়া: ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৯৯১ টাকা
ল্যাব সহকারী (জীববিজ্ঞান) সাম্মি আক্তার: ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৯৯১ টাকা
চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. মাসুম বিল্লাহ: ৪ লাখ ৩৪ হাজার ১৭৫ টাকা
চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. সাইফুল ইসলাম: ৩ লাখ ২৮ হাজার ২১৫ টাকা
পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. নাজমুল ইসলাম: ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৪০৭ টাকা
চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হামীব গাজী: ৪ লাখ ৩৪ হাজার ১৭৫ টাকা
প্রভাষক (ফকিহ) জাহিদ হোসেন: ৬ লাখ ৪৩ হাজার ৩৭০ টাকা।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (অর্থ) ও এমপিও বাছাই ও অনুমোদন কমিটির সদস্যসচিব মোহাম্মদ শুকুর আলম মজুমদার স্বাক্ষরিত চিঠিতে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে জানানো হয়, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অতিরিক্ত বা বিধিবহির্ভূতভাবে অর্থ উত্তোলন দেশের প্রচলিত আর্থিক বিধিমালার চরম লঙ্ঘন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশিত অর্থ সমর্পণ না করলে তাদের বিরুদ্ধে সরকারি পাওনা আদায় আইন (পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্ট) অনুযায়ী সার্টিফিকেট মামলা পরিচালনা করা হবে।
শিক্ষা ও প্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা জনবল কাঠামো বহির্ভূত নিয়োগ এবং জালিয়াতির মাধ্যমে এমপিওভুক্তি বন্ধে অধিদপ্তরের এই কঠোর প্রশাসনিক অবস্থান একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। এতে করে শিক্ষা খাতে আর্থিক স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ভুয়া বা নিয়মবহির্ভূত পদ সৃষ্টি করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।
ইতোমধ্যে অধিদপ্তরের এই আদেশের অনুলিপি পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধার্থে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ), ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক, সংশ্লিষ্ট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ইকামাতেদ্বীন মডেল কামিল মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও অধ্যক্ষের কার্যালয়ে পাঠাকরণ সম্পন্ন করা হয়েছে।