বিশেষ প্রতিবেদক
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। একই সঙ্গে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গঠিত এই জোটে যুক্ত থাকলেও ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার কথা জানিয়েছেন তিনি। রবিবার (২ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই পদক্ষেপকে ইরানকে কেন্দ্র করে কোনো নেতিবাচক অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পাশাপাশি আলোচনায় উঠে আসে বহুল আলোচিত সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গৃহীত সাম্প্রতিক উদ্যোগের কথা।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির রিয়াদের সঙ্গে ঢাকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন মাত্রার দিকে আলোকপাত করে বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল ধর্মীয় তীর্থযাত্রা, ওমরাহ কিংবা বার্ষিক হজের বাধ্যবাধকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুই দেশের বন্ধনকে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ও সামরিক অংশীদারিত্ব হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, পবিত্র মক্কা ও মদিনা নগরীর রক্ষক হিসেবে পরিচিত সৌদি আরবের ভূখণ্ডগত নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশটি যেকোনো ধরনের সহায়তা চাইলে বাংলাদেশ নীতিগত ও নৈতিক অবস্থান থেকে সর্বদা পাশে দাঁড়াবে। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের এই প্রতিশ্রুতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুসংহত অবস্থান তৈরির প্রয়াস নির্দেশ করে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশের এই কূটনৈতিক নীতিনির্ধারণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এবং রেড সি বা লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল সুনিশ্চিত করতে হুতি বিদ্রোহীদের তৎপরতা রোধের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবে সৌদি জোটে অংশগ্রহণ সত্ত্বেও তেহরানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের চ্যানেল খোলা রাখা ঢাকার সুষম পররাষ্ট্রনীতির বহিঃপ্রকাশ। উপদেষ্টা পুনর্ব্যক্ত করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে জাতীয় স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক নৌপথের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য। এতে করে কোনো বিশেষ রাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন করা বা কারোর বিরুদ্ধে বৈরী পরিবেশ সৃষ্টি করার কোনো উদ্দেশ্য ঢাকার নেই।
সৌদি আরবে অবস্থানরত লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মী এবং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম বড় উৎস হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা দেশটির জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। সামরিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতার এই উদ্যোগ দুই দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা খাতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কার্যকর ভূমিকা রাখার মাধ্যমে শান্তিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিধানে নিজেদের সক্ষমতা আবারও তুলে ধরছে। এই কৌশলের মাধ্যমে বাংলাদেশ যেমন নিজ দেশের সমুদ্র বাণিজ্য নিরাপত্তা রক্ষা করবে, তেমনি সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় ভিতের ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হবে।
আলাপচারিতার দ্বিতীয় অংশে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে বিদেশ থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনগত ও সামাজিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করা হয়। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, পলাতক সাবেক এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং এ নিয়ে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত এই উদ্যোগে ইতিবাচক অগ্রগতি নিশ্চিত হলে শিগগিরই তা সংবাদ মাধ্যম তথা দেশবাসীকে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হবে।
উল্লেখ্য, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান ও আদালতের আদেশের পর সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বেশ কিছু স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করা হয়। এরপর থেকে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানায়। তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক মুখোমুখি করা বর্তমান সরকারের আইনি শাসনের নীতি বহাল রাখারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইঙ্গিত দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং কূটনৈতিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান জোরদার করছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা রক্ষায় কঠোর অবস্থান বজায় রাখছে।