বিশেষ প্রতিবেদক
বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রবাহের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে পরিকল্পিত ভুল তথ্য (মিসইনফরমেশন) ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য (ডিসইনফরমেশন)। তথ্যের অনিয়ন্ত্রিত প্রাচুর্যের যুগে রাজনৈতিক স্বার্থহাসিল এবং জনমত প্রভাবিত করতে এই কৃত্রিম বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘মিডিয়া কমিশন’ গঠন, ১৯৭৩ সালের প্রেস আইন সংশোধন এবং সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের বিভাগ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সরকারের এই নীতিগত অবস্থানের কথা জানানো হয়।
রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত উক্ত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সাংবাদিকতার সার্বিক সংকট ও উত্তরণের পথ নিয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এবং দ্য নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবির। সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীবৃন্দ এবং দেশের প্রবীণ ও নবীন সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনায় মন্ত্রী উল্লেখ করেন, পূর্বে যেখানে তথ্যের অপ্রতুলতা বা তথ্য পাওয়ার সীমাবদ্ধতাই সাংবাদিকতার বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল, সেখানে বর্তমানে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে ভুয়া ও বিকৃত সংবাদের ব্যাপকতা বহুগুণ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে তিনি বলেন, আধুনিক রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশে জাতীয় নির্বাচনের সময়ে দোদুল্যমান ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে কিংবা জনমত ঘুরিয়ে দিতে পরিকল্পিতভাবে অপতথ্য ছড়ানো হয়। এটি স্বাধীন সাংবাদিকতার পাশাপাশি সামগ্রিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রশাসনিক পদ্ধতির প্রয়োগে জোর দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
গণমাধ্যমের কাঠামোগত দুর্বলতা ও পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে তথ্যমন্ত্রী জানান, দেশের বহু সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র প্রদান করলেও তাদের নিয়মিত ও ন্যায্য বেতন-ভাতা প্রদান থেকে বিরত থাকে। ফলে সংবাদকর্মীরা এক ধরনের সামাজিক ও আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ, সম্পাদকমণ্ডলী ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, পেশাগত কাজের যথার্থ মূল্যায়ন, মর্যাদা এবং সার্বিক আর্থিক সুরক্ষা প্রদান ব্যতিরেকে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা বিকাশ লাভ করতে পারে না।
সংবাদমাধ্যমের পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের বিষয়ে তিনি জানান, একটি শক্তিশালী ‘মিডিয়া কমিশন’ গঠনের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা ইতিবাচকভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া বর্তমানে ধারাবাহিক অগ্রগতির মধ্যে রয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় অতীতে গঠিত বিভিন্ন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালা ও প্রতিবেদনসমূহ গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হবে, যেন বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সাংবাদিকতার একটি সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড তৈরি করা যায়।
আইনি কাঠামোর আধুনিকায়নের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, ১৯৭৩ সালের বিদ্যমান প্রেস আইন সংশোধনের আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো গণমাধ্যমের অনুমোদন বা নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রচলিত ‘সরকারবিরোধী’ শব্দটির পরিবর্তে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ শব্দ স্থাপন করা হবে। গণতান্ত্রিক চর্চায় সরকার ও রাষ্ট্রের পার্থক্য তুলে ধরে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইতিমধ্যেই এই সংশোধনীতে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও অখণ্ডতার স্বার্থ রক্ষা করেই এই আইনি পরিমার্জন বাস্তবায়ন করা হবে।
উপস্থিত বক্তারা এই আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগকে সময়োপযোগী হিসেবে আখ্যা দেন এবং বলেন যে, পেশাদারিত্ব বজায় রেখে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পরিবেশনই কেবল অপতথ্যের আগ্রাসন থেকে সমাজকে রক্ষা করতে পারে। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষা এবং অপতথ্য প্রতিরোধে একাডেমিয়া, গণমাধ্যম ও সরকারের সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার ওপর সভায় একমত প্রকাশ করা হয়।