রাজশাহী — জেলা প্রতিনিধি
রাজনীতিতে অশালীন ভাষার ব্যবহার গণতন্ত্র, সভ্যতা ও সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও ভিন্নমত থাকাটা স্বাভাবিক, তবে বক্তব্য ও রাজনৈতিক চর্চায় শালীনতা ও ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। অশালীন বক্তব্য কোনো উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে না, বরং এটি সমাজে বিদ্বেষ ও বিভাজন তৈরি করে।
রবিবার (২ আগস্ট) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আয়োজিত ‘জুলাই রক্তাক্ত : স্মরণ ও প্রত্যয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনকালের সমালোচনা করে বিএনপি নেতা রিজভী বলেন, তৎকালীন সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে অপপ্রচার ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্য প্রদান করেছিল। বিএনপি বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে এবং সৈরশাসনের প্রতিবাদ জানিয়েছে, তবে কখনোই রাজনৈতিক ভাষার মার্জিত সীমা অতিক্রম করেনি। বর্তমানে রাজনীতিতে কিছু তরুণ নেতার বক্তব্যে যে ধরনের ভাষা ও আচরণের বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে, তা সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশে বড় বাধা। এটি অতীতের একচ্ছত্র ও কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক অপসংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ছাত্র-জনতার সাম্প্রতিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমাজে ঘৃণা ছড়ানোর রাজনীতি কখনো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। জুলাইয়ের গণআন্দোলনে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব ঐক্যের ফলেই কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন ঘটেছে। তাই নতুন প্রজন্মের তরুণ রাজনীতিকদের উচিত অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি পরমতসহিষ্ণু ও ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, তরুণ রাজনীতিকদের চিন্তা-ভাবনা প্রগতিশীল, গঠনমূলক ও দেশের সার্বিক উন্নয়নেরমুখী হওয়া বাঞ্ছনীয়। নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনীতির মাঠে এসে পশ্চাৎমুখী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে জোট গঠন করা রাজনৈতিক আদর্শ ও দর্শনের জায়গা থেকে সমীচীন নয়।
জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তৎকালীন সরকার বলপ্রয়োগ ও দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের গণদাবি ও বীরত্বের ইতিহাসকে মূল্যায়ন করতে তারা ব্যর্থ হয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ঠেকানো যায়নি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, জুলাইয়ের এই গণঅভ্যুত্থান মূলত বিগত ১৭ বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ আপসহীন রাজনৈতিক সংগ্রামেরই এক চূড়ান্ত পরিণতি।
প্রশাসনিক নিয়োগ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রিজভী যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যবস্থার উদাহরণ টেনে বলেন, বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক দেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক পদগুলোতে নতুন নিয়োগ বা রদবদল একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। গণতান্ত্রিক কাঠামোর অধীনে প্রশাসনের সংস্কার ও পুনর্গঠন নীতিগতভাবে কোনো অনিয়ম নয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মেরুকরণ প্রসঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে দাবি করেন, ভবিষ্যতে বিরোধী শক্তি ক্ষমতায় এলে প্রশাসনে ব্যাপক দলীয়করণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
উক্ত আলোচনা সভায় বিশেষ বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির। তিনি দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনের অতীতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হয়রানি বন্ধ করা এবং সুস্থ শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার ওপর জোর দেন তিনি। এর পাশাপাশি সম্প্রতি উত্থাপিত বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য ও ঘটনাবলীর বিষয়েও তিনি সংগঠনের সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই স্মরণসভায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত উপাচার্যবৃন্দ, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান রিটন, কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় ছাত্রদলের শীর্ষনেতৃবৃন্দ, মহানগর বিএনপি এবং দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। সভায় বক্তারা জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি স্মরণ করার পাশাপাশি দেশে একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।