স্বাস্থ্য ডেস্ক
দেশে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও দুইজনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪২৩ জন রোগী। নতুন করে মারা যাওয়া দুইজন বরিশাল ও খুলনা বিভাগের বাসিন্দা। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫৬ জন এবং মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ১০৪ জনে। রবিবার (২ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গু বিষয়ক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্থানভিত্তিক আক্রান্তের ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নতুন রোগীদের মধ্যে একটা বড় অংশ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং আশপাশের অঞ্চলের। ২৪ ঘণ্টার হিসাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন ৪৭ জন রোগী। একই সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল ৬৯ জন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগের অন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আরও ৩৮ জন নতুন রোগী ভর্তি নিশ্চিত করা হয়েছে।
রাজধানী ঢাকার বাইরে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়েও এডিস মশাবাহিত এই রোগের সংক্রমণ লক্ষ্যণীয়ভাবে বিস্তৃত হচ্ছে। গত এক দিনে খুলনায় সর্বোচ্চ ৮১ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগে ৫৬ জন, বরিশালে ৫৪ জন, চট্টগ্রামে ৪৯ জন, রাজশাহীতে ২৯ জন, রংপুরে ১৬ জন এবং সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চারজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। মফস্বল ও জেলা শহরের কেন্দ্রগুলোতে রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় চিকিৎসাসেবা ও হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সার্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট ১৬ হাজার ১০৪ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ইতোমধ্যেই চিকিৎসাসেবা গ্রহণ শেষে সুস্থ হয়ে ১৪ হাজার ৯৩ জন বাড়ি ফিরেছেন। কেবল শেষ ২৪ ঘণ্টাতেই সারাদেশে বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৪৭২ জন রোগী। তবে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণহানির ধারাবাহিক ঘটনা আঞ্চলিক পর্যায়ে ডেঙ্গুর শারীরিক জটিলতা ও মারাত্মক ধরনের উচ্চ ঝুঁকির বিষয়টি নির্দেশ করে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ও বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার প্রজনন মৌসুম দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রতি বছরই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মারাত্মক আকার ধারণ করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঐতিহাসিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশে ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ শুরু করার পর থেকে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছিল ২০২৩ সালে। ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭ সময়কালজুড়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা নিবন্ধিত হয় এবং রেকর্ড ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু ঘটে। পরবর্তী বছরগুলোতেও উচ্চ সংক্রমণের ধারা অব্যাহত থাকে, যা এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঘরবাড়ি, আঙিনা ও নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে থাকা রোধ করাই মূল পদক্ষেপ। প্লাস্টিকের ড্রাম, ফুল ও গাছের টব, কন্টেইনার এবং ছাদ ও বারান্দায় তিন দিনের বেশি জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা বংশবৃদ্ধি করে। এছাড়া ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিরেকে নিজ উদ্যোগে অতিরিক্ত এনএসএআইডি (NSAID) জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ সেবন না করার কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। উচ্চ জ্বর, তীব্র শরীর ব্যথা, বমিভাব, পেটে ব্যথা কিংবা শরীর দুর্বল হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে রক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা।