বাংলাদেশ ডেস্ক
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার অসামান্য আত্মত্যাগ সত্ত্বেও রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক পরিচালনায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সার্কিট হাউস সংলগ্ন তথ্য ভবন মিলনায়তনে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার বদল হলেও দুর্নীতি এবং ফাইল আটকে রাখার পুরনো আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রশাসনে এখনও বিদ্যমান রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের নিজস্ব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মানসিক ও গুণগত রূপান্তর এখনও দৃশ্যমান নয়। ইতিপূর্বে যারা অনিয়ম ও অনৈতিক সুবিধার সাথে যুক্ত ছিল, তাদের অনেকেই কৌশল বদলে বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে এবং আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবি করছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার রদবদলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। তা না হলে গণ-অভ্যুত্থানের মহান আত্মত্যাগ ও আসল উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে না।
প্রশাসনিক জটিলতা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগকে আশাব্যঞ্জক হিসেবে উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, নতুন প্রশাসনিক দৃষ্টান্ত স্থাপনে প্রধানমন্ত্রীর প্রচেষ্টাকে সফল করতে সর্বস্তরের সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান—বাংলাদেশের ইতিহাসের এই প্রতিটি বাঁকই জনগণের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম ও জীবনদানের ফসল। জুলাই অভ্যুত্থান একটি নির্দিষ্ট দাবি থেকে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের গণ-আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। সে কারণে সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের পূর্ণ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে একটি মেধাভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক ও তরুণবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার বিকল্প নেই।
আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বিগত ১৭ বছরের নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সংগ্রাম, জেল-জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করার ধারাবাহিকতায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুচিন্তিত কৌশল এবং শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলেই রাজপথের আন্দোলন সর্বজনীন রূপ পেয়েছিল। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান একই গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার প্রকাশ। মুক্তিযুদ্ধ বা গণ-অভ্যুত্থান—কোনোটিকেই কোনো কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর নিজস্ব প্রকল্পে পরিণত করতে দেওয়া হবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।
অনুষ্ঠানে অন্যান্য বক্তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি ও চেতনা সংরক্ষণ এবং বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এ কে এম আবদুল হাকিম আন্দোলনের সময় সংঘটিত সকল অন্যায় ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু বিচার সুনিশ্চিত করার জোর দাবি জানান। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী ‘জুলাই শহীদ স্মৃতিসৌধ’ নির্মাণ এবং শহীদ পরিবারগুলোর উপযুক্ত পুনর্বাসন ও সহায়তার আহ্বান জানান। একই সাথে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ জুলাই অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক পটভূমি বিকৃত করার যেকোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ তরুণদের সাহসিকতা ও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের স্মৃতিচারণ করেন। আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মো. শাহ আলম ও সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্য চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। স্মারক কর্মসূচির অংশ হিসেবে অনুষ্ঠানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। এর পাশাপাশি তথ্য অধিদপ্তরের একটি বিশেষ স্মারক প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন এবং তথ্য ভবন প্রাঙ্গণে গণ-অভ্যুত্থানের চিত্র সংবলিত আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়।