নিজস্ব প্রতিবেদক
কওমি মাদরাসাসংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ গ্রহণ, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, সত্যতা যাচাই (ফ্যাক্ট-চেকিং) এবং তদারকি কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে একগুচ্ছ নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে দেশের কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডগুলোর সর্বোচ্চ অথরিটি ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’। সংস্থাটি একটি কেন্দ্রীয় ‘কওমি মাদরাসা পর্যবেক্ষণ সেল’ গঠন, বিশেষ হটলাইন সেবা চালু এবং প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা প্রদানে একটি উচ্চপর্যায়ের লিগ্যাল প্যানেল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বুধবার রাজধানীর আল-হাইআতুল উলয়ার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘কওমি মাদরাসাবিরোধী অপপ্রচার রোধ ও উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় আল-হাইআতুল উলয়ার করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মাওলানা মাহমুদুল হাসানের নির্দেশে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় আল-হাইআতুল উলয়ার অধীন ছয়টি কওমি শিক্ষা বোর্ডের শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন আল-হাইআতুল উলয়ার কো-চেয়ারম্যান ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) সিনিয়র সহসভাপতি মাওলানা সাজিদুর রহমান।
সভায় দেশের কওমি মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি, সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বোর্ড প্রতিনিধিরা অভিমত ব্যক্ত করেন যে, কোনো প্রতিষ্ঠানে অপরাধ, অনিয়ম বা অনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হলে তার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো অবস্থাতেই অপরাধী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে একই সঙ্গে তারা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঘটা কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে সার্বিক কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘিরে একপক্ষীয় ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তার, নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, মানবিক চরিত্র গঠন এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে কওমি মাদরাসার দীর্ঘদিনের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি সংঘটিত কিছু ঘটনায় ব্যক্তিক্রমী বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত দায় সম্পূর্ণ কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপানোর চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত যেকোনো তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়া গ্রহণ বা শেয়ার না করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের জন্য সংবাদমাধ্যমের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে কওমি মাদরাসা সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য, অভিযোগ ও প্রয়োজনীয় নথি আদান-প্রদানের জন্য একটি বিশেষ নম্বর ঘোষণা করা হয়। ০১৭০০-৭৬৩১৭৮ নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক বার্তা, ভয়েস কল, ছবি, ভিডিও এবং প্রাসঙ্গিক যেকোনো দলিল পাঠানো যাবে। পাশাপাশি আলেমদের সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় ‘কওমি মাদরাসা পর্যবেক্ষণ সেল’ গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে অধীনস্থ ছয়টি শিক্ষা বোর্ডকে তাদের আওতাধীন মাদরাসাগুলোর প্রশাসনিক ও ধর্মীয় পরিবেশ তদারকি করার জন্য পৃথক ‘মাদরাসা মনিটরিং সেল’ গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। আগামী দিনে মাদরাসা পরিদর্শন ও সার্বিক তদারকি কার্যক্রম আরও কঠোর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী লিগ্যাল প্যানেল গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই প্যানেল কওমি মাদরাসা ও সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় আইনি পরামর্শ এবং সহায়তা প্রদান করবে। নবগঠিত কেন্দ্রীয় ‘কওমি মাদরাসা পর্যবেক্ষণ সেল’-এ মাওলানা সাজিদুর রহমান, মাওলানা মুফতি রুহুল আমীন, মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু, মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী, মাওলানা আব্দুল বছীর, মাওলানা মুফতি এনামুল হক, মাওলানা একরাম হোসাইন ওয়াদুদী, মাওলানা মুহসিন শরীফ এবং মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ আলীকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সভায় আল-হাইআতুল উলয়ার অফিস ব্যবস্থাপক মাওলানা মো. অছিউর রহমানসহ অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।