বিশেষ প্রতিবেদক
দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়ন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক কারবার প্রতিরোধ এবং পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আওতায় সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে সারা দেশে অপরাধবিরোধী বিশেষ ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত সিসিটিভি ক্যামেরা। একই সঙ্গে পুলিশের অভ্যন্তরীণ পেশাদারি বৃদ্ধি ও অপরাধ দমনে সর্বাত্মক জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ প্রশাসন।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, দেশের শীর্ষ অপরাধী ও সংঘবদ্ধ চক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার অংশগ্রহণে দেশব্যাপী যৌথ অভিযান চলছে। অভিযানে ২০২৬ সালের ১ মে থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বিশেষ ও নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ৭২৫ জন সন্দেহভাজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে কেবল বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেই ৩২ হাজার ৯০৮ জনকে আটক করা হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন নিয়মিত মামলা ও নিয়মিত টহলের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করা হয় ৮৩ হাজার ৮১৭ জনকে।
দেশব্যাপী পরিচালিত এই অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, জব্দকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ২৪৩টি আধুনিক ও দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র, যার মধ্যে ৭৬টি পিস্তল, ৫০টি বন্দুক, ৩৩টি এলজি, ৩০টি শুটার গান, ১৮টি রিভলভার, ১৫টি পাইপগান এবং সাবমেশিনগান ও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। এছাড়া ২ হাজার ৩১৩ রাউন্ড গুলি, ৮৮টি ম্যাগাজিন, ৪৩টি দেশীয় বিস্ফোরক, ২ কেজি গানপাউডার, ৫০৩টি দেশীয় অস্ত্র এবং ১০ হাজারের বেশি শক্তিশালী চকোলেট বোমা উদ্ধার করা হয়।
মাদকবিরোধী অভিযানের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায় ৭৬ লাখ ৪০ হাজার পিস ইয়াবা, ৮ হাজার ২৮৪ প্যাকেট হেরোইন, ৩ হাজার ১৮৬ বোতল ফেনসিডিল, ৬ হাজার ৮৩৫ বোতল বিদেশি মদ এবং ৫ হাজার ৩৩৬ প্যাকেট গাজা উদ্ধার করেছে। মাদক চোরাচালান ও বিক্রির অভিযোগে মোট ১৪ হাজার ১৫৭টি নতুন মামলা দায়ের এবং ২০ হাজার ৪৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে।
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো জানিয়েছে, কেবল শারীরিক টহল বা অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে অপরাধ প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশ জানায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সম্পূর্ণ অংশকে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। মহাসড়কের ১৬টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এআই চালিত বিশেষ ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, যা রিয়েল-টাইমে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে মনিটর করা হচ্ছে। এই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে মহাসড়কে ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদক পাচার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি যানবাহন চলাচলও সুশৃঙ্খল হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সবকটি জাতীয় মহাসড়কে এআই প্রযুক্তি চালিত সমন্বিত সিসিটিভি নেটওয়ার্ক চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, অপরাধী বা মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত কারোর কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক বা গোষ্ঠীগত পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। জামিনে মুক্তি পেয়ে যারা পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে, তাদের কঠোর নজরদারিতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ও প্রতিটি থানায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তা ও সাধারণ সদস্যদের মানবিক আচরণ ও পেশাদারি বজায় রাখার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সতর্ক করা হয়েছে যে, কোনো পুলিশ সদস্যের অবহেলা বা শৃঙ্খলাভঙ্গের প্রমাণ মিললে কঠোর বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে, ভালো কাজের ক্ষেত্রে মিলবে বিশেষ স্বীকৃতি ও পুরস্কার।