আইন আদালত ডেস্ক
রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ট্রাকচালক মো. হোসেন হত্যা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন (চার্জগঠন) শুনানির তারিখ পিছিয়ে আগামী ১৩ আগস্ট নির্ধারণ করেছেন আদালত। আসামিপক্ষের এক সদস্য আদালতে অনুপস্থিত থাকা এবং রাষ্ট্র ও আসামি—উভয় পক্ষের সময়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক এই নির্দেশ প্রদান করেন।
রবিবার (২৬ জুলাই) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এর বিচারক রবিউল আলমের আদালতে মামলাটির চার্জগঠন শুনানির দিন ধার্য ছিল। তবে শুনানির নির্ধারিত দিনে কারাগারে থাকা অন্যতম আসামি ফোরকান হোসেনকে আদালতে হাজির করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ও রাষ্ট্রপক্ষ বিচারকাজ পরিচালনার স্বার্থে শুনানি স্থগিতের আবেদন জানান। একই সঙ্গে আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও শুনানির প্রস্তুতি ও আনুষঙ্গিক আইনি প্রক্রিয়ার জন্য অতিরিক্ত সময়ের আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক আবেদন মঞ্জুর করে পরবর্তী শুনানির জন্য নতুন এই দিন ধার্য করেন।
আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখী গণমাধ্যমকে বিচারিক কার্যক্রমের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মামলার মোট ৩৪ জন আসামির মধ্যে বর্তমানে ৪ জন কারাগারে আটক রয়েছেন। আজ শুনানিকালে কারাগারে থাকা আসামিদের মধ্যে জুনাইদ আহমেদ পলক, সাদেক খান ও শাহজাহান খানকে আদালতে হাজির করা হয়েছিল। অন্যদিকে, মামলায় জামিনে থাকা ৮ জন আসামি সশরীরে আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তবে কারাগারে থাকা আসামি ফোরকান হোসেনকে উপস্থিত না করায় শুনানি মুলতবি করা হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মামলার অপরাপর ২২ জন আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
মামলার এজাহার ও নথি সূত্রের বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশব্যাপী বিস্তৃত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে ১৯ জুলাই বিকেলে রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই দিন নিহত মো. হোসেন পেশায় একজন ট্রাকচালক ছিলেন। তিনি রাজধানীর গাবতলী এলাকায় নিজের ব্যবহৃত ট্রাকটি পার্কিং করে হেঁটে মোহাম্মদপুরস্থ নিজ বাসায় ফিরছিলেন। পথে চাঁদ উদ্যান এলাকায় আন্দোলনকারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের সৃষ্টি হলে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর নিহত ট্রাকচালক হোসেনের মা রীনা বেগম বাদী হয়ে ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটিতে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের শীর্ষপর্যায়ের ব্যক্তি, স্থানীয় এমপি ও রাজনৈতিক কর্মীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশে বলপ্রয়োগ এবং হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়। ঘটনার তদন্ত শুরু করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। দীর্ঘ তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের পর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আকরামুজ্জামান ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, আন্দোলনের সময় সাধারণ নাগরিকদের ওপর বেআইনি বলপ্রয়োগ ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার দায় সাবেক সরকারের নীতি নির্ধারণী মহল এড়াতে পারে না। চার্জশিটে উল্লেখ করা প্রধান আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, ঢাকার সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খান, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান।
এ ছাড়া অভিযুক্তদের তালিকায় আরও রয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর আসিফ আহম্মেদ, তারেকুজ্জামান রাজিব, শেখ বজলুর রহমান, নুর মোহাম্মদ সেন্টু, তোফায়েল সিদ্দিক ওরফে তুহিন, রহমান মিয়া ওরফে এ কে এম অহিদুর রহমান, পলাশ, ওলিউর রহমান, খলিলুর রহমান, ইমন, এস এম রিয়াজুল হক তামিম, মাসুদুর রহমান বিপ্লব, আব্দুস সাত্তার ভূইয়া ওরফে এম এ সাত্তার, পারভেজ ওরফে গোল্ডেন পারভেজ, সুমন মিয়া ওরফে কাইল্লা সুমন, মিলন হোসেন, সোহেল ওরফে ভূইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেল, সলিম উল্লাহ সলু, ইরফান, মুহাম্মদ বদিউল আলম ওরফে বদিউজ্জামান, ফুরকান হোসেন, শাহজাহান খান, সাজ্জাদ হোসেন, ফারুক হোসেন অভি এবং নাইমুল হাসান রাসেল।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় এই মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চার্জগঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে মামলার মূল বিচারকাজ অর্থাৎ সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। পলাতক আসামিদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিচারকাজ এগিয়ে নেওয়া হবে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে। আগামী ১৩ আগস্ট চার্জগঠন শুনানি শেষে আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন আনুষ্ঠানিকভাবে আসামিদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু করা হবে কি না।