আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও সার্বভৌম অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত সামরিক কিংবা রাজনৈতিক নীতির প্রকাশ্য বিরোধিতা করতে পিছপা হবেন না বলে জানিয়েছেন দেশটির নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণের পর একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া নিজের প্রথম প্রধান বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই শক্ত অবস্থান স্পষ্ট করেন। ট্রাম্পের সঙ্গে প্রথম ফোনালাপ অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ হলেও মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধানের ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব দেননি তিনি। পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাস্তবতার নিরিখে লন্ডনকে নিজস্ব কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন নতুন ব্রিটিশ সরকারপ্রধান।
দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বার্নহ্যাম জানান, নতুন মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে প্রাথমিক আলাপ যথেষ্ট ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য সংঘাত বা উত্তেজনা বৃদ্ধি নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের ভেতরে পূর্ব থেকেই উদ্বেগ বিদ্যমান রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে অবিকল সহমত পোষণ করা সম্ভব নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখাটাই স্বাভাবিক। ব্রিটেনের সাধারণ মানুষের জন্য যা সঠিক ও যুক্তিযুক্ত মনে হবে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেটির সপক্ষে কথা বলতে তিনি কোনো দ্বিধা করবেন না।
রাজনৈতিক আদর্শ ও পরিচালনা কৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জানান, জনগণের কাছাকাছি থেকে তাঁদের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সে অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করাই তাঁর রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার পরও এই মৌলিক কার্যপদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কৌশলগত তোষণ বা অন্ধ আনুগত্যের বদলে দেশের সার্বভৌম ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দেওয়া একজন প্রধান মন্ত্রীর সাংবিধানিক দায়িত্ব বলে তিনি মনে করেন।
যুক্তরাজ্যের সামরিক বাজেট বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির বরাদ্দ নির্ধারণের বিষয়েও সাক্ষাৎকারে দীর্ঘ আলোচনা হয়। উল্লেখ্য, নতুন অর্থমন্ত্রী জন হিলি পূর্ববর্তী সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালে ২০৩০ সালের মধ্যে সামরিক বরাদ্দ জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার নীতিগত দাবি জানিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। এই প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা তারিখ বাঁধতে অস্বীকৃতি জানান প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম। তিনি জানান, নতুন অর্থমন্ত্রীর পূর্ববর্তী অবস্থান সম্পর্কে তিনি অবগত হলেও, এ মুহূর্তে তাঁদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো চলতি বছরের শেষভাগে ঘোষিত হতে যাওয়া বাজেটের আগে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ পরিকল্পনার প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থান নিশ্চিত করা। পরবর্তীতে বিস্তারিত পর্যালোচনা শেষে রাজস্ব প্রাপ্তি ও কৌশলগত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা হবে।
যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে গত কয়েক বছরের ঘনঘন নেতৃত্ব পরিবর্তন ও প্রশাসনিক অস্থিরতার পটভূমিতে নির্ধারিত মেয়াদের পূর্বে আগাম সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। ২০২৯ সালের আগে নতুন কোনো নির্বাচনের সম্ভাবনা খারিজ করে তিনি মন্তব্য করেন, দেশের জনগণ বারবার নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্য দিয়ে যেতে ইচ্ছুক নয়। গত চার বছরে একাধিক সরকার পরিবর্তনের ফলে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা দূর করে ব্রিটেনকে দ্রুত স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনাই বর্তমান প্রশাসনের প্রধান কাজ বলে তিনি মনে করেন।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আটলান্টিকের উভয় পারের দীর্ঘদিনের মিত্রতার সম্পর্ক বজায় রেখো সামরিক ও বাণিজ্যিক খাতে স্বকীয়তা বজায় রাখা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কার ও প্রতিরক্ষা বরাদ্দের অর্থ যোগান, অন্যদিকে পরিবর্তিত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রেক্ষাপটে ব্রিটেনের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা—এই দ্বিমুখী কৌশল নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব গুণাবলির কঠোর পরীক্ষা নেবে।