বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যকার বহুমাত্রিক কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের ধারাবাহিকতায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পর্যটনসমৃদ্ধ এই দেশে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাসঙ্গিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা সাপেক্ষে প্রবাসী কর্মীদের এই নতুন সুযোগ তৈরির বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। শুক্রবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার নানা দিক বিস্তারিতভাবে পর্যালোচিত হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও বিষয়াবলী সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলা সফর শেষ করে দেশে ফেরার পথে ব্যাংককে যাত্রাবিরতি করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। এই সময়ে তিনি থাইল্যান্ডের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজাবাত ইসারাভাকদির সঙ্গে এক বিশেষ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বৈঠকে উভয় প্রতিনিধি দীর্ঘদিনের প্রথাগত ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও অর্থবহ করে তুলতে দুই দেশের অর্থনীতি ও মানবসম্পদ খাতের গতিশীলতাকে কাজে লাগানোর বিষয়ে জোর দেন।
বৈঠকে আলোচনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক সমন্বয়সাধন। বিশেষ করে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক শর্তাবলী দ্রুত সম্পন্ন করে থাইল্যান্ডের বিভিন্ন উৎপাদন ও সেবা খাতে প্রায় ১০ হাজার দক্ষ ও আধা-দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা। থাইল্যান্ডের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য এবং প্রথাগত শ্রমবাজারের পাশাপাশি থাইল্যান্ডে এত বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান বাস্তবায়িত হলে তা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাতকে যেমন সম্প্রসারিত করবে, তেমনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের নির্ভরযোগ্যতার নতুন স্বীকৃতি অর্জনে সহায়তা করবে।
কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পর্যটন শিল্পের প্রসার, যৌথ বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ শক্তিশালী করার কৌশল নিয়েও বিস্তর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। উভয় পক্ষই বাণিজ্য ব্যবধান কমানো এবং দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগে বিদ্যমান প্রশাসনিক বাধাগুলো দূর করতে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কূটনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে বৈঠকে আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের (ASEAN) প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে উঠে আসে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক ও কৌশলগত জোট আসিয়ানের ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ হিসেবে বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে পূর্ণ সমর্থন জানাতে থাইল্যান্ডের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানান উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুত বিকাশমান অর্থনৈতিক বাজার এবং কৌশলগত জোটে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার লক্ষ্যে আসিয়ানের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধন সুদৃঢ় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আসিয়ানের ডায়ালগ পার্টনারের স্বীকৃতি লাভ করলে তা বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য, আঞ্চলিক সংযোগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের আহ্বানের জবাবে থাইল্যান্ডের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজাবাত ইসারাভাকদি নিশ্চিত করেন যে, আসিয়ানের সাথে বাংলাদেশের এই প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে থাইল্যান্ডের নীতিগত ও গঠনমূলক সহযোগিতা জোরদার থাকবে। একই সাথে তিনি আঞ্চলিক অর্থনীতি ও শান্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান ও ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
বৈঠকের চূড়ান্ত পর্যায়ে diplomatic protocol অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের জন্য এক আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দেন উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। আমন্ত্রণের মাধ্যমে শীর্ষপর্যায়ের সফরের মধ্য দিয়ে ঢাকা ও ব্যাংককের মধ্যকার বহুমাত্রিক সম্পর্ককে একটি টেকসই কাঠামোর ওপর দাঁড় করানোর আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর এই সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফর দুই দেশের মধ্যকার বিমান ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতকরণ, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে গতি আনা এবং পারস্পরিক বাণিজ্য বাড়াতে একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।