বিশেষ প্রতিবেদক
দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের (এএসইএএন) সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার প্রচেষ্টায় জোটটির বর্তমান চেয়ার ফিলিপাইনের পূর্ণ সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ। ম্যানিলায় আয়োজিত এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মা. থেরেসা পি. লাজারোর কাছে এ সমর্থন ব্যক্ত করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। একই সঙ্গে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করতে আসিয়ানের সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ঐতিহাসিক ‘ট্রিটি অব অ্যামিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন’ (টিএসি)-এর ৫০তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় এক আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উক্ত সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকটি দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি আঞ্চলিক কূটনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মূল এজেন্ডা হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই প্রভাবশালী অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক জোটের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আসিয়ানের সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গভীর করতে আগ্রহী। সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনারের মর্যাদা লাভ করলে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত বিনিময় এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের যৌথ কাজ করার সুযোগ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি সংযোগ সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে, যা পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
এ ছাড়া বৈঠকে বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বিশেষ করে নার্সিং খাতের পেশাদারিত্ব বিকাশ, যৌথ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম এবং মেডিকেল ট্যুরিজম বা চিকিৎসা পর্যটনের বিকাশে ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণের ওপর বিশেষ জোর দেন দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। শিক্ষা, শ্রমবাজার এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের যাতায়াত সুগম করতে ভিসা জটিলতা নিরসন জরুরি বলে দুই পক্ষই একমত পোষণ করেন। পাশাপাশি দুই দেশে অবস্থানরত প্রবাসী নাগরিকদের পারিবারিক পুনর্মিলন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। দীর্ঘায়িত এই সংকট দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি উল্লেখ করে ড. খলিলুর রহমান বলেন, প্রথাগত ও অপ্রথাগত নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনই একমাত্র স্থায়ী সমাধান। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট হিসেবে আসিয়ান মিয়ানমার সরকারের ওপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এ বিষয়ে ফিলিপাইনের দ্ব্যর্থহীন সমর্থন কামনা করে বাংলাদেশ।
প্রত্যুত্তরে ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং আলোচনাধীন ক্ষেত্রগুলোতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বৃদ্ধিতে যৌথ কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে নিয়মিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং ফলোআপ বৈঠকের ওপর জোর দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান বাজারগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানো এবং আসিয়ান জোটে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনৈতিক কৌশলের প্রধান লক্ষ্য। ম্যানিলার এই বৈঠক আসিয়ানের আনুষ্ঠানিক অংশীদারত্ব অর্জনে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ইতিবাচক গতি প্রদান করবে বলে আশা করা হচ্ছে।