নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশকে একটি গণতান্ত্রিক, সর্বজনীন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার সমন্বিত রোডম্যাপ অনুযায়ী কাজ করছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ভিত্তিকে শক্তিশালী করা, সামষ্টিক অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং সাধারণ মানুষের সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নই বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোর মূল ও প্রধান অগ্রাধিকার।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাজধানী ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী ‘বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্স ২০২৬ (বিডিসি ২০২৬)’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা তুলে ধরেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নীতি-নির্ধারক, অর্থনীতিবিদ এবং উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে গবেষণাভিত্তিক বেসরকারি সামাজিক সংগঠন আয়োজিত এই সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনে উত্থাপিত আলোচনা ও দেশের বিদ্যমান বাস্তবতার আলোকেও এলজিআরডি মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে এক ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষা জাতীয় জীবনের সামনে একটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করেছে। রাজনৈতিক সংস্কার ও নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে আনার যে সার্বজনীন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তাকে বাস্তবায়ন করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
দেশের বর্তমান সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মন্ত্রী জানান, বহির্বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির বিরূপ প্রভাব দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ও অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এবং ইউরোপের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে যে সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটেছে, তা বাংলাদেশের মতো বিকাশমান উন্নয়নশীল দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও সামষ্টিক সূচকগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘদিন ধরে প্রথাগত দুর্নীতি, অবৈধভাবে অর্থ পাচার এবং আর্থিক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ব্যাংকিং খাতে কাঠামোগত সংস্কার, আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণ এবং সার্বিক রাজস্ব নীতি সংস্কারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। জনগণের অদম্য শক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে পুনরায় শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো সম্ভব হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সরকারের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোকপাত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, গতিশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ঝিমিয়ে পড়া ব্যাংকিং খাতকে পুনরায় কার্যকর করার বহুমুখী রূপরেখা বাস্তবায়িত হচ্ছে। জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে দেশব্যাপী বিশেষ অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সুগম হবে, অন্যদিকে জাতীয় আয় বাড়াতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদ ও অগণিত ত্যাগী মুক্তিকামী মানুষের অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং স্বৈরাচারবিরোধী সাম্প্রতিক নাগরিক আন্দোলনগুলোতে নিজেদের জীবন উৎসর্গকারী ছাত্র-জনতার ত্যাগকেও জাতির জন্য এক যুগান্তকারী ও দিশারী অধ্যায় বলে অভিহিত করেন।
খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার বিষয়ে তিনি জানান, সরকার ভারী ও ক্ষুদ্র শিল্পের সুষম বিকাশ, কৃষিভিত্তিক প্রযুক্তির সার্বিক রূপান্তর এবং সৃজনশীল ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনীতির প্রসারে নিরবচ্ছিন্ন নীতি সহায়তা প্রদান করছে। দেশের সাম্প্রতিক জাতীয় বাজেটে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দেশীয় শিল্পায়নকে উৎসাহিত করতে বিশেষ শুল্ক সুবিধা ও প্রণোদনার যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তা জাতীয় রাজস্ব নীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির বিষয়ে এলজিআরডি মন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান, সব রাজনৈতিক দল ও অংশীদারদের সঙ্গে গঠনমূলক ও সমন্বিত আলোচনার ভিত্তিতে সাংবিধানিক ও আইনি সংস্কারের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। দেশে একটি টেকসই, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বিনির্মাণ করতে হলে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করা আবশ্যক।
সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রসার ঘটানোর প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, আধুনিক বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই পরোপকারী, সাহসী ও ঐক্যবদ্ধ। সব নাগরিকের সম্মিলিত শ্রম, নিষ্ঠা ও কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে একটি বৈষম্যহীন, উন্নত, নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।