স্বাস্থ্য ডেস্ক
দেশের প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বত্র সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এবং প্রাথমিক পর্যায়েই জটিল রোগ শনাক্তকরণের লক্ষ্যে সরকার দেশব্যাপী ‘হোম-টু-হোম হেলথ স্ক্রিনিং’ বা ঘরে ঘরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানের লেক পার্কে ‘হাইজিন ফর হেলথ বাংলাদেশ’ (সুস্বাস্থ্যের জন্য স্বাস্থ্যবিধি বাংলাদেশ) শীর্ষক এক কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এই উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো, দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তোলা।
এই বৃহৎ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকার দেশব্যাপী এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, নিয়োগপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের ৮০ শতাংশই হবেন নারী। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীদের স্বাস্থ্যগত নানা বিষয়, বিশেষ করে প্রজনন স্বাস্থ্য ও ক্যান্সার সংক্রান্ত সংকোচ দূর করতে নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। এই বিপুল সংখ্যক নারী স্বাস্থ্যকর্মী দেশের প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরাসরি কাজ করবেন।
নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হবে তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ নারীদের স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতন করা। তারা নারীদের শেখাবেন কীভাবে ঘরে বসেই স্তন ক্যান্সার পরীক্ষার প্রাথমিক ধাপগুলো সম্পন্ন করতে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্যমতে, বাংলাদেশে নারীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ স্তন ও জরায়ু ক্যান্সার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক সংকোচের কারণে রোগ একেবারে শেষ পর্যায়ে গিয়ে ধরা পড়ে, যখন চিকিৎসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হয়ে যায়। সরকারের এই ‘হোম-টু-হোম’ উদ্যোগের ফলে প্রাথমিক অবস্থাতেই ক্যান্সার বা অন্যান্য জটিল রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হবে। ফলশ্রুতিতে দ্রুততম সময়ে উন্নত চিকিৎসা প্রদান করে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা সম্ভব বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আশা প্রকাশ করেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে জানান, নিযুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা একটি অত্যাধুনিক ও বিশেষায়িত মেডিকেল বক্স নিয়ে বাড়ি বাড়ি যাবেন। এই পোর্টেবল বক্সের মাধ্যমে ঘরে বসেই মানুষের রক্তচাপ মাপা, ওজন নির্ণয়, ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা এবং লিপিড প্রোফাইল বা কোলেস্টেরল পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য পরীক্ষাগুলো করা সম্ভব হবে। বর্তমানে অসংক্রামক রোগ (নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ) যেমন—উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিস দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এসব রোগে ভুগলেও তাদের বড় অংশই নিজেদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে অবগত নন। ঘরে বসে এসব পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি হলে সাধারণ মানুষ নিয়মিত তাদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবেন। এছাড়া এই হোম-স্ক্রিনিং পদ্ধতি দেশের হাসপাতালগুলোর বহির্বিভাগে রোগীদের অতিরিক্ত চাপ কমাতেও সাহায্য করবে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশে সিজারিয়ান সেকশন বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের ক্রমবর্ধমান হার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশের অধিকাংশ শিশুই সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করছে। অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সেকশনের ফলে একদিকে যেমন প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে নবজাতকও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, সিজারের পর প্রকৃতি প্রদত্ত এবং নবজাতকের জন্য সবচেয়ে বড় প্রোটিন ও অ্যান্টিবডির উৎস ‘শালদুধ’ থেকে শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে। শালদুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরিতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। কিন্তু মায়েদের কর্মব্যস্ততা, অসচেতনতা, অবহেলা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে মাতৃদুগ্ধ পান করানোর হার ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। এর প্রভাবে দেশের আগামী প্রজন্ম মারাত্মক পুষ্টিহীনতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা জাতীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় অশনিসংকেত।
জনসচেতনতা ও সুস্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সুস্থ জীবনযাপনের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই। একটি সুস্থ, মেধাভিত্তিক ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের পূর্বশর্ত হলো সেই দেশের নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। সরকারের লক্ষ্য হলো টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনের অংশ হিসেবে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (ইউনিভার্সেল হেলথ কভারেজ) নিশ্চিত করা। ‘হাইজিন ফর হেলথ বাংলাদেশ’ এর মতো উদ্যোগগুলো দেশের মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূলধারার স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে বড় ভূমিকা পালন করবে।
গুলশানের লেক পার্কে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে জনস্বাস্থ্য ও সমাজসেবামূলক বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ ২০২৬ খেতাবপ্রাপ্ত সামানজার সাঈদ, গুলশান সোসাইটির সভাপতি ওমর সাদাত, মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডিরেক্টর আজরা মাহমুদ, মানবাধিকার সংস্থা ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম এবং গুলশান সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান মৃধাসহ আরও অনেকে। সরকারের এই নতুন উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট বেসরকারি ও সামাজিক সংস্থাগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যখাতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে বলে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেন।