বিশেষ প্রতিবেদক
মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা নাগরিকদের দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে সরকার। ‘রোহিঙ্গা বিষয়ক জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন কমিটি’ নামের এই কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রধানমন্ত্রী। গত ১২ জুলাই সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ১১ সদস্যের এই শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপদেষ্টা। কমিটি পরিচালনায় গতিশীলতা আনতে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারকে ‘প্রধান সমন্বয়ক’ এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালককে সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন পুলিশের আইজিপি, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক।
কমিটিকে মাঠপর্যায়ে ও কৌশলগত বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য আরও ৫ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন— শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি), পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) অতিরিক্ত আইজিপি, বিজিবির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস), এনএসআইয়ের পরিচালক (সীমান্ত) এবং সোশ্যাল স্ট্যাবিলিটি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (এসএসআইবি) পরিচালক।
প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে নবগঠিত এই কমিটির কার্যপরিধি সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এটি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতিগত ও কৌশলগত বিষয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং মাঠপর্যায়ে কর্মরত বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থার কাজের তদারকি ও সমন্বয় করবে। এ ছাড়া, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্তবর্তী এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাজের পরিধি ও সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র নির্ধারণে কমিটি দিকনির্দেশনা দেবে।
টেকসই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে বেগবান করতে কমিটির প্রধান সমন্বয়কের সরাসরি তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ ‘পর্ষদ’ গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পর্ষদ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ভাগ করে দেবে এবং রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ ও দ্রুত প্রত্যাবাসনের জন্য একটি মূল ‘জাতীয় কর্মকৌশল’ তৈরি করবে। বিশেষ এই পর্ষদকে আগামী ৯০ দিন বা ৩ মাসের মধ্যে এই কৌশলপত্র প্রণয়ন করে জাতীয় কমিটির কাছে জমা দেওয়ার জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
নব্য গঠিত এই জাতীয় কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরকে (ডিজিএফআই)। সংস্থাটি কমিটির প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোগত সব ধরনের সাচিবিক সুবিধা নিশ্চিত করবে। তবে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, কমিটির সিদ্ধান্ত এবং সভাপতির নির্দেশক্রমে পরবর্তীতে অন্য যেকোনো গোয়েন্দা সংস্থা বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকেও নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এই সাচিবিক দায়িত্ব অর্পণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি, কাজের সুবিধার্থে কমিটি প্রয়োজনে যেকোনো সামরিক বা বেসামরিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান কিংবা যেকোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কমিটিতে কো-অপ্ট বা অন্তর্ভুক্ত করার এখতিয়ার রাখবে।
কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে এই উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এই কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা রক্ষা ও টেকসই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করবে বলে আশা করা হচ্ছে।