নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের সড়ক মহাসড়কগুলোতে গত জুন মাসে মোট ৫৩০টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসব মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ৪৬২ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৭৫০ জন। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) সর্বশেষ মাসিক সড়ক দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বরাবরের মতোই মোটরসাইকেল ও ভারী যানবাহনগুলো সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে।
বিআরটিএর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানের স্বাক্ষরিত এই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশের সবকটি বিভাগীয় কার্যালয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এই পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে। গত ১২ জুলাই প্রতিবেদনটি চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ১৩ জুলাই তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। দেশের সড়ক নিরাপত্তার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অংশ হিসেবে বিআরটিএ নিয়মিত এই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। জুনের এই পরিসংখ্যান দেশের সড়ক নিরাপত্তা বাস্তবায়নে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোকে পুনর্বার সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রতিবেদনের বিভাগভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত জুন মাসে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। এই বিভাগে ১৭১টি সড়ক দুর্ঘটনা নিবন্ধিত হয়েছে, যাতে ১৪৩ জন নিহত এবং ২৬৪ জন আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার সংখ্যা ও হতাহতের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজধানী ঢাকা বিভাগ। ঢাকা বিভাগে আলোচ্য সময়ে ১১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৭৬ জন বিভিন্নভাবে আহত হয়েছেন। ভৌগোলিক অবস্থান এবং যানবাহনের উচ্চ ঘনত্বের কারণে এই দুটি বিভাগে দুর্ঘটনার হার বেশি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
অন্যান্য বিভাগের মধ্যে রাজশাহী বিভাগে ৬৫টি দুর্ঘটনায় ৬৭ জন নিহত ও ৬৬ জন আহত হয়েছেন। খুলনা বিভাগে ৪৮টি দুর্ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও ৮৮ জন আহত হয়েছেন। বরিশাল বিভাগে ৩৫টি দুর্ঘটনায় ২০ জন নিহত ও ৭৯ জন আহত হয়েছেন। সিলেট বিভাগে ২১টি দুর্ঘটনায় ২০ জন নিহত ও ২৬ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া দেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগে ৪৭টি দুর্ঘটনায় ৪৭ জন নিহত ও ২৩ জন আহত হয়েছেন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ২৮টি দুর্ঘটনায় ২২ জন নিহত ও ২৮ জন আহত হয়েছেন। দেশের প্রতিটি বিভাগেই এই ধরনের প্রাণহানি সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং চালকদের অসচেতনতাকে নির্দেশ করে।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের দুর্ঘটনাগুলোতে সর্বমোট ৮২৭টি বিভিন্ন ধরনের যানবাহন জড়িত ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যার তালিকায় রয়েছে ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান, যার সংখ্যা ১৭১টি। এছাড়া ১৫৩টি বাস বা মিনিবাস, ১৩৮টি মোটরসাইকেল এবং ৬২টি অটোরিকশা এই দুর্ঘটনাগুলোতে যুক্ত ছিল। অন্যান্য যানবাহনের মধ্যে ছিল ২৭টি মোটরকার বা জিপ, ৫৫টি পিকআপ, ১৮টি মাইক্রোবাস, ৭টি অ্যাম্বুলেন্স, ২৩টি ভ্যান, ৬টি ট্রাক্টর, ২২টি ইজিবাইক, ২৭টি ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং আরও ১১৮টি অন্যান্য স্থানীয় যানবাহন। ভারী ও দ্রুতগতির যানবাহনের পাশাপাশি অননুমোদিত ও ধীরগতির যানবাহনের মহাসড়কে চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
যানবাহনভিত্তিক প্রাণহানির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বরাবরের মতোই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। জুনে এককভাবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১২১ জন আরোহী প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭১ জন নিহত হয়েছেন ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান দুর্ঘটনায়। দূরপাল্লার বাস বা মিনিবাস দুর্ঘটনায় ৪৫ জন এবং অটোরিকশা দুর্ঘটনায় ৪১ জন নিহত হয়েছেন। অন্যান্য যানের মধ্যে পিকআপ দুর্ঘটনায় ২৬ জন, ব্যাটারিচালিত রিকশায় ১৭ জন, মোটরকার বা জিপে ১২ জন, ইজিবাইকে ১২ জন, ভ্যান দুর্ঘটনায় ১১ জন, মাইক্রোবাসে ৬ জন, অ্যাম্বুলেন্সে ৪ জন, ট্রাক্টরে ২ জন এবং অন্যান্য বিভিন্ন প্রকার যানের দুর্ঘটনায় ৯৪ জন নিহত হয়েছেন।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার এই ধারাবাহিকতা রোধ করতে হলে ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ, চালকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধ করা এবং মহাসড়কে ছোট ও ধীরগতির যান চলাচল সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। প্রতি মাসে শত শত মানুষের এই অকাল মৃত্যু দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তদারকি আরও জোরদার করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।