রাজধানী ডেস্ক
টানা বর্ষণ ও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আজ রবিবার ভোর ৫টা থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসের সাতসকালে শুরু হওয়া এই বৃষ্টিপাতে ঢাকার মিরপুর, মতিঝিল, নয়াপল্টন, ধানমন্ডি ও পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে কোথাও হাঁটু, আবার কোথাও কোমরসমান পানি জমে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কর্মস্থলগামী মানুষ, সাধারণ পথচারী ও শিক্ষার্থীরা। গণপরিবহন সংকটের পাশাপাশি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রাস্তায় যানবাহন বিকল হয়ে পড়ায় সকাল থেকেই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যা নগরবাসীর দুর্ভোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এদিকে গত কয়েক দিন ধরে দেশজুড়ে চলমান এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে দেশের সামগ্রিক বন্যা পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগে টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং আকস্মিক পাহাড়ধসের ঘটনায় গত ছয় দিনে অন্তত ৪৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। একই সময়ে এই বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় প্রায় ৮ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উপচে পড়া পানির তোড়ে এবং জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রায় ২৪২ কিলোমিটার সড়ক সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে, যার ফলে ওই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তাদের সূত্রমতে, টানা বর্ষণের ফলে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে এবং একাধিক আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা গ্রামীণ অবকাঠামো ও কৃষিখাতের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের এই উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যে দেশের সার্বিক আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে নতুন পূর্বাভাস জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আবহাওয়া অফিসের সর্বশেষ বুলেটিনে জানানো হয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় থাকায় পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। অতিভারি বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে পাহাড়ধসের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। একই সাথে দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোকে সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার এই চিরচেনা জলাবদ্ধতার মূল কারণ অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং খাল ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়া। প্রতি বছর সামান্য বৃষ্টিতেই যেভাবে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো জলমগ্ন হয়ে পড়ে, তা নিরসনে স্থায়ী ও সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা জরুরি। অন্যদিকে, পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় কাটার প্রবণতা বন্ধ না হলে এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা না গেলে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রাম বিভাগের এই মানবিক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দারা।