আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৩৪২ জনে দাঁড়িয়েছে। বিপর্যয়কর এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬Style হাজার ৭৪০ জন বাসিন্দা আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির যোগাযোগ ও তথ্য মন্ত্রণালয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অসংখ্য মানুষ নিখোঁজ থাকায় উদ্ধারকাজের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে সোমবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানায়, গত ২৪ জুন উত্তর-কেন্দ্রীয় ভেনেজুয়েলায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে যথাক্রমে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, এই জোড়া ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের মাত্র ১০ থেকে ২২ কিলোমিটার গভীরে, যার ফলে উত্তর ও মধ্য অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা মারাত্মকভাবে কেঁপে ওঠে। প্রথম দফায় শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ওই অঞ্চলে ৯৯৫টিরও বেশি আফটারশক বা অনুকম্পন রেকর্ড করা হয়েছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এবং উদ্ধার তৎপরতাকে ব্যাহত করছে।
ভেনেজুয়েলার তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিকতম বুলেটিন অনুযায়ী, ভূমিকম্পে দেশটির উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভয়াবহ এই দুর্যোগে পুরো দেশে অন্তত ৮৫৬টি বহুতল ভবন ও স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৯0টি অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দুর্যোগকবলিত এলাকাগুলো থেকে এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৬২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ১৭ হাজার ৩৪৫ জন নাগরিক সম্পূর্ণ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। বাস্তুচ্যুত এই বিপুল জনগোষ্ঠীর আবাসন নিশ্চিত করতে দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে ৭৯টি অস্থায়ী আশ্রয়শিবির স্থাপন করা হয়েছে।
এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং উপদ্রুত এলাকায় জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে কারাকাস প্রশাসন। উদ্ধারকাজে গতি আনতে উপদ্রুত এলাকাগুলোতে ৪ হাজার ৮৮ জন আন্তর্জাতিক উদ্ধারকর্মী নিযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণভাবে ২৯ হাজার ৫৬৭ জন পেশাদার উদ্ধারকর্মী এবং ২৭ হাজার ৪৮২ জন স্বেচ্ছাসেবী মাঠপর্যায়ে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ৮৬ হাজার ৭৯৪টি পরিবারের মধ্যে জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। জরুরি মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত ৯ হাজার ৫৮৫ মেট্রিক টন খাদ্যসামগ্রী এবং ৬ লাখ ৬৯ হাজার ৮ লিটার পানীয় জল সরবরাহ করা হয়েছে। এ ছাড়া সাময়িকভাবে চালু করা চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে ২৩ হাজার ৮২০ জন আহত ও অসুস্থ রোগীকে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়েছে।
জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ভেনেজুয়েলার এই মানবিক সংকটে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাগুলোর প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় দুর্গম এলাকাগুলোর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পেতে আরও সময় লাগবে। জাতিসংঘের জরুরি ত্রাণ সমন্বয়কারী দফতর এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপের কথা উল্লেখ করে জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য জরুরি তহবিল সংগ্রহের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, আবাসন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে বিপুল আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন হবে।