সংসদ প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত ৩১ হাজার ৯৮ কোটি ৮৮ লাখ ১৫ হাজার টাকার বরাদ্দ কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়যুক্ত ব্যয় ব্যতীত অন্যান্য ব্যয় সম্পর্কিত মঞ্জুরি দাবির ওপর আলোচনা শেষে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। বাজেট বরাদ্দের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনাকালে দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক ও যুক্তি-তর্ক অনুষ্ঠিত হয়।
বাজেট আলোচনার সূত্রপাত করে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দের ওপর ছাঁটাই প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য উল্লেখ করে দেশের সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ তোলেন। বিরোধী দলের দেওয়া তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬টি অপহরণ, ২ হাজার ২১৪টি চুরি এবং ১২৯টি পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে বলে তিনি সংসদকে অবহিত করেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বরাদ্দকৃত অর্থের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
বিরোধী দলের এসব সমালোচনার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, বিগত ১০-১৫ বছরের তুলনায় দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঐতিহাসিক উন্নতি হয়েছে। অধিকাংশ অপরাধের সূচকে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধের খাতভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমান সরকার সফলভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তবে ধর্ষণের মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এর পেছনে আইনি প্রক্রিয়ার সহজীকরণকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, অতীতে সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক ভুক্তভোগী মামলা করতে পারতেন না। বর্তমানে অনলাইনে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও থানায় সরাসরি প্রথম তথ্য বিবরণী (এফআইআর) দায়েরের সুযোগ তৈরি হওয়ায় মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মূলত অপরাধের চেয়ে আইনি প্রতিকার পাওয়ার হার বৃদ্ধির নির্দেশক।
নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রামিসা হত্যা মামলার উদাহরণ দেন, যার বিচারিক প্রক্রিয়া রেকর্ড ১৭ দিনে সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তনু হত্যা মামলায় ডিএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমে আসামি শনাক্তকরণের অগ্রগতির কথাও তিনি উল্লেখ করেন। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হচ্ছে না এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে পুলিশ অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের রূপরেখা তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে আধুনিক ল্যাবরেটরি, ডগ স্কোয়াড এবং প্রযুক্তিনির্ভর সরঞ্জামসহ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিভাগ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক জুয়া ও সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে ১৮৬৭ সালের প্রাচীন আইন সংস্কার করে একটি যুগোপযোগী ও আধুনিক জুয়া প্রতিরোধ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংসদে দীর্ঘ আলোচনা ও যুক্তি-তর্কের পর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে উত্থাপিত ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। পরবর্তীতে স্পিকারের পরিচালনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত পূর্ণ বাজেট বরাদ্দটি সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদিত হয়।