বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই করতে দুই দেশের আমদানি-রপ্তানিতে ভারসাম্য আনা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। সম্প্রতি এক আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, নতুন উড়োজাহাজ ক্রয়, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য খাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের অংশীদারিত্বের চিত্র তুলে ধরেন। রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, বাণিজ্যিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো জোরদার করতে সম্প্রতি উভয় দেশ একটি ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’তে সম্মত হয়েছে।
রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বাণিজ্যনীতির মূল ভিত্তি হলো মুক্ত, ন্যায্য ও পারস্পরিক বাণিজ্য। বাংলাদেশ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাক রপ্তানি করলেও সেই তুলনায় মার্কিন পণ্য আমদানি করছে বেশ কম। দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে এই ব্যবধান ঘুচানো প্রয়োজন। নতুন পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির ফলে বাংলাদেশ যেমন আকর্ষণীয় শুল্ক সুবিধা পাবে, তেমনই এর শর্ত মেনে দেশের কাস্টমসব্যবস্থা, শ্রম খাত ও সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশের আধুনিকায়ন ঘটবে। এই সংস্কারগুলো বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক টেকসই উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
দুই দেশের বাণিজ্যিক ব্যবধান কমাতে বাংলাদেশ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে উন্নত মানের গম ও কৃষিপণ্য আমদানি বাড়িয়েছে। মার্কিন গমে অপচয়ের হার মাত্র ২ শতাংশ, যা অন্য দেশের তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী। পাশাপাশি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস তাদের বহর সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ১৪টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা দুই দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের বিপুল চাহিদার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ভবিষ্যতে এ খাতে ১৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহী, তবে সরকারের দেওয়া শর্তগুলো ব্যাবসায়িকভাবে লাভজনক ও যৌক্তিক হওয়া আবশ্যক।
অভিবাসন ও ভিসানীতি প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত জানান, বিশ্বব্যাপী মার্কিন ভিসানীতিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করা, জাল কাগজপত্র জমা দেওয়া এবং অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে মার্কিন দূতাবাস বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, দুই দেশের প্রতিরক্ষা চুক্তি ও অংশীদারিত্ব আরো জোরদার করা হবে, যেন বাংলাদেশ বৈশ্বিক মানদণ্ডের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে পারে। এছাড়া জনস্বাস্থ্য রক্ষায়, বিশেষ করে যক্ষ্মা ও হাম নির্মূলে মার্কিন সহায়তা চলমান রয়েছে এবং শিগগিরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ৫ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য সহযোগিতা চুক্তি সই হতে যাচ্ছে।
আগামী জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে বছরজুড়ে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এই উদযাপনকে কেন্দ্র করে ঢাকায় ২৫০টি রিকশাকে মার্কিন পতাকার লাল, সাদা ও নীল রঙে সাজানো হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও স্বাধীনতার পটভূমি সর্বসাধারণের কাছে তুলে ধরতে ‘ফাউন্ডার্স মিউজিয়াম’ নামক একটি ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে। চলমান ফুটবল বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দল নকআউট পর্বে উন্নীত হওয়ায় বাংলাদেশের ক্রীড়ামোদিদের সমর্থন ও শুভেচ্ছা প্রত্যাশা করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত।