খেলাধূলা ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে আনুষ্ঠানিক অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন জার্মানির কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যার। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে হেরে জার্মানি বিদায় নেওয়ার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত জানান। এর মাধ্যমে জার্মান জাতীয় দলের জার্সিতে এই অভিজ্ঞ তারকার দীর্ঘ ও সফল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পরিসমাপ্তি ঘটল।
চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে প্যারাগুয়ের মুখোমুখি হয়েছিল চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে নয়্যারের দুর্দান্ত গোলরক্ষণ নৈপুণ্যে ম্যাচটি গোলশূন্য সমতায় শেষ হয়। ম্যাচের বিভিন্ন পর্যায়ে প্যারাগুয়ের ফরোয়ার্ডদের একাধিক নিশ্চিত গোলের প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক। তবে শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারের ভাগ্য নির্ধারণী লড়াইয়ে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয় জার্মানিকে। এই পরাজয়ের পরপরই ৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।
জার্মানির ফুটবল ইতিহাসে ম্যানুয়েল নয়্যারকে অন্যতম সেরা এবং প্রভাবশালী গোলরক্ষক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০০৯ সালে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেকের পর থেকে তিনি দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দলের রক্ষণভাগের মূল ভরসা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতীয় দলের জার্সিতে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অনন্য পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি নিজেকে বিশ্বফুটবলের অন্যতম শীর্ষ স্তরে প্রতিষ্ঠিত করেন।
নয়্যারের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে। সেবার জার্মানির চতুর্থবারের মতো বিশ্বসেরা হওয়ার পেছনে তার অবদান ছিল অগ্রগণ্য। পুরো টুর্নামেন্টে পোস্টের নিচে তার অটল ও নির্ভীক উপস্থিতি জার্মানিকে শিরোপা জয়ে বিশেষভাবে সাহায্য করে। টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষক হিসেবে তিনি লাভ করেন মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ পুরস্কার।
আধুনিক ফুটবলে গোলরক্ষকের প্রচলিত ধারণাকে বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ম্যানুয়েল নয়্যারের ভূমিকা অনন্য। গোলপোস্টের নির্দিষ্ট সীমানা ছাড়িয়ে মাঠের রক্ষণভাগে এসে দলের আক্রমণ প্রতিহত করার বিশেষ কৌশল, যা ফুটবল বিশ্বে ‘সুইপার-কিপার’ নামে পরিচিত, তা নয়্যারের মাধ্যমেই আধুনিক ফুটবলে নতুন মাত্রা পায়। রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের সঙ্গে সমন্বয় সাধন এবং বল পাসিংয়ের ক্ষেত্রে তার পারদর্শিতা বিশ্বের তরুণ গোলরক্ষকদের জন্য একটি আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে নয়্যার জার্মানির হয়ে শতাধিক ম্যাচ খেলেছেন এবং বেশ কয়েক বছর সফলভাবে দলের অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করেছেন। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে তার নেতৃত্ব এবং পারফরম্যান্স জার্মানিকে বহু স্মরণীয় জয় উপহার দিয়েছে। ইনজুরির কারণে ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে বাধার সম্মুখীন হলেও প্রতিবারই তিনি সফলভাবে মাঠে ফিরে এসেছেন এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, ম্যানুয়েল নয়্যারের অবসর গ্রহণ জার্মান ফুটবলে একটি বড় শূন্যতার সৃষ্টি করবে। দলের দীর্ঘদিনের এক নম্বর গোলরক্ষকের বিদায়ের পর জাতীয় দলের গোলপোস্ট সামলানোর জন্য নতুন নেতৃত্ব তৈরি করা এখন জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (ডিএফবি) জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে অভিজ্ঞ এই তারকার বিদায়ের পর তার উত্তরসূরি হিসেবে যারা আসবেন, তাদের জন্য নয়্যারের রেখে যাওয়া মানদণ্ড স্পর্শ করা বেশ কঠিন হবে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিলেও ক্লাব ফুটবলে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।