নিজস্ব প্রতিবেদক
পবিত্র হজ পালন শেষে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশি হাজিদের ফিরতি কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট ২১১টি ফিরতি ফ্লাইটে এখন পর্যন্ত ৭৭ হাজারের বেশি হাজি নিরাপদে দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন। এদিকে, চলতি বছর পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে সৌদিতে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ও স্বাভাবিক কারণে মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশি হাজির সংখ্যা বেড়ে ৫৫ জনে দাঁড়িয়েছে। আগামী ১ জুলাই হাজিদের ফিরতি ফ্লাইট পরিচালনার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সমাপ্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকাশিত সর্বশেষ হজ বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২৯ আইনুযায়ী ২৯ জুন) পর্যন্ত সৌদি আরব থেকে মোট ২১১টি ফিরতি ফ্লাইটে দেশে ফিরেছেন ৭৭ হাজার ৬৯ জন বাংলাদেশি হাজি। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রত্যাবর্তনকারী হাজিদের মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ৪৫৯ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে ৭২ হাজার ৬১০ জন দেশে ফিরে এসেছেন। বাকি হাজিরা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নির্ধারিত ফ্লাইটে দেশে ফিরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
চলতি বছর হজ পালনকালে সৌদিতে অবস্থানকালীন সময়ে মোট ৫৫ জন বাংলাদেশি হজযাত্রী শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। হজ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে ৪৩ জন পুরুষ এবং ১২ জন নারী রয়েছেন। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে পবিত্র মক্কা নগরীতে, সেখানে ৩৭ জন বাংলাদেশি মারা যান। এছাড়া মদিনায় ১৭ জন এবং জেদ্দায় একজন বাংলাদেশি হাজির মৃত্যু হয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এ বছর হজের মূল আনুষ্ঠানিকতার স্থান মিনা ও মুজদালিফায় কোনো বাংলাদেশি হাজির মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। সৌদির আইন অনুযায়ী, পবিত্র ভূমিতে মৃত্যুবরণকারীদের স্থানীয় নিয়মেই মক্কা বা মদিনার নির্ধারিত কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
ফিরতি ফ্লাইট ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ তিনটি প্রধান বিমান সংস্থা দায়িত্ব পালন করছে। প্রকাশিত বুলেটিন অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১১১টি ফিরতি ফ্লাইট পরিচালনা করে ৩৪ হাজার ১২২ জন হাজিকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে। সৌদি আরবের জাতীয় বিমান সংস্থা সৌদিয়া এয়ারলাইনস ৭০টি ফ্লাইটে ২৫ হাজার ৩৭৭ জন এবং দেশটির বাজেট এয়ারলাইনস ফ্লাইনাস ৩০টি ফ্লাইটে ১১ হাজার ৪৩ জন হাজিকে বাংলাদেশে পৌঁছে দিয়েছে। এর বাইরে ট্রানজিট ও অন্যান্য বাণিজ্যিক এয়ারলাইনসের নিয়মিত ফ্লাইটের মাধ্যমে আরও ৬ হাজার ৫২৭ জন হাজি দেশে ফিরেছেন। এয়ারলাইনসগুলোর সূচি অনুযায়ী, শেষ মুহূর্তের ফ্লাইটগুলো যথাসময়ে পরিচালনার জন্য ঢাকা ও জেদ্দা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করছে।
পবিত্র হজের সময় হাজিদের নিবিড় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মক্কা ও মদিনায় বিশেষ মেডিকেল টিম কাজ করেছে। হজ বুলেটিনের তথ্যমতে, হজের সময় এবং পরবর্তী সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন ৪১৫ জন বাংলাদেশি হাজি। চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর সিংহভাগ সুস্থ হয়ে উঠলেও বর্তমানে ৭ জন হাজি সৌদির বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের স্থাপিত অস্থায়ী সৌদি মেডিকেল সেন্টারগুলো থেকে এ পর্যন্ত মোট ৬৭ হাজার ১৪০ জন হাজিকে প্রাথমিক ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি, মক্কা ও মদিনায় স্থাপিত আইটি হেল্প ডেস্কের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া হাজিদের খুঁজে বের করা, লাগেজ সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনসহ বিভিন্ন তথ্য ও লজিস্টিক সেবা পেয়েছেন ২৮ হাজার ৪৫২ জন হাজি।
চলতি বছরের হজ ক্যালেন্ডার ও প্রশাসনিক রোডম্যাপ অনুযায়ী, গত ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে প্রথম প্রাক-হজ ফ্লাইট যাত্রা করে, যা টানা এক মাস পরিচালিত হয়ে ২১ মে শেষ হয়। এরপর ২৬ মে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সর্ববৃহৎ সমাবেশ পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হয়। হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষে গত ৩০ মে থেকে হাজিদের নিয়ে ফিরতি ফ্লাইট বাংলাদেশে আসা শুরু করে।
হজ অফিসের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর সৌদি সরকার কর্তৃক বাংলাদেশের জন্য মোট ৭৮ হাজার ৫০০ জন হজযাত্রীর কোটা বরাদ্দ করা হয়েছিল। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ৫৬৫ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে ৭৩ হাজার ৯৩৫ জনসহ মোট ৭৮ হাজার ৫০০ জনই হজের চূড়ান্ত নিবন্ধন সম্পন্ন করে সৌদি আরব গমন করেন। দীর্ঘ প্রায় আড়াই মাসের এই বিশাল হজ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম আগামী ১ জুলাই শেষ ফিরতি ফ্লাইটের মাধ্যমে সফলভাবে সম্পন্ন হতে যাচ্ছে।