বিশেষ প্রতিবেদক
দেশে পেঁয়াজ ও পাট বীজের আমদানিনির্ভরতা শূন্যে নামিয়ে আনতে সরকার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি জানান, আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজনীয়তা আর থাকবে না। একই সাথে, আগামী তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশ পাট বীজ উৎপাদনে পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে। সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীতে স্মার্ট কৃষিতে সরকারি বিনিয়োগ বিষয়ক বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান। অনুষ্ঠানে দেশের কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকের বাজার সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে মন্ত্রী দেশের কৃষি খাতের সার্বিক উন্নয়ন ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে কৃষির অবদান অনস্বীকার্য। দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কৃষিখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কৃষি খাতের আধুনিকায়নের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কৃষকদের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বিপণন এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। কৃষিমন্ত্রী বলেন, মাঠপর্যায়ের কৃষকদের কাছে সঠিক সময়ে বাজারসংক্রান্ত সঠিক তথ্য না পৌঁছানোর কারণে তারা প্রায়শই উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং তথ্যগত ঘাটতির এই সমস্যা সমাধানে সরকার বর্তমানে কৃষি তথ্য ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন শক্তিশালীকরণে বিশেষ জোর দিচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকদের সরাসরি বাজারের সাথে যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি এবং ফসল কাটার পরবর্তী অপচয় রোধে সরকারের একটি বড় প্রকল্পের ঘোষণা দেন মন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দেশজুড়ে দুই হাজার মিনি কোল্ডস্টোরেজ বা ক্ষুদ্র হিমাগার স্থাপন করা হবে। গ্রামীণ পর্যায়ে সমবায় ভিত্তিতে এসব হিমাগার পরিচালিত হবে, যেখানে ১৫ থেকে ২০ জন কৃষক একত্রে তাদের উৎপাদিত পচনশীল পণ্য সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কোল্ডস্টোরেজের অভাবে প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ শাকসবজি ও কৃষিপণ্য নষ্ট হয়, তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে এবং কৃষকরা পণ্য মজুত রেখে সুবিধাজনক সময়ে বিক্রি করতে পারবেন।
দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ পেঁয়াজ ও উচ্চফলনশীল পাট বীজের জন্য প্রতিবেশী দেশসহ আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহ সংকটের প্রভাব স্থানীয় বাজারে পড়ে। সরকারের নতুন এই কর্মপরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এই দুই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতের আমদানিনির্ভরতা পুরোপুরি দূর হবে। এতে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল থাকবে এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।