জাতীয়ডেস্ক
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে প্রতিবছর প্রায় ১৫৬ কোটি টাকার বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির কারণে ট্রাস্টের এই আর্থিক দায় ক্রমাগত বাড়ছে। এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের ওপর, যার ফলে তাদের কল্যাণ সুবিধা ও অন্যান্য প্রাপ্য অর্থ সময়মতো পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে ২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জমাকৃত প্রায় ৪৪ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর কল্যাণ সুবিধা প্রাপ্তির আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ঝুলে রয়েছে।
রবিবার (১৪ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় এবং প্রথম বাজেট অধিবেশনের ষষ্ঠ কার্যদিবসে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. গোলাম রছুলের এক তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী দেশের বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ভাতা প্রাপ্তিতে বিলম্বের কারণ ও সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
সংসদে উত্থাপিত মন্ত্রীর লিখিত জবাব অনুযায়ী, ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট আইন, ১৯৯০’ এবং ‘প্রবিধানমালা, ১৯৯৯’ এর আওতাধীন নিয়মানুযায়ী এই ট্রাস্টটি পরিচালিত হয়। এর মূল আয়ের উৎস হলো এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসিক মূল বেতন থেকে কেটে নেওয়া ৪ শতাংশ চাঁদা এবং ট্রাস্টের বিভিন্ন স্থায়ী আমানত ও বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত বার্ষিক মুনাফা। বর্তমানে এই খাতগুলো থেকে কল্যাণ ট্রাস্টের বার্ষিক মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ৬৮৪ কোটি টাকা। বিপরীতে, প্রতিবছর অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণ সুবিধা প্রদান বাবদ ট্রাস্টের প্রয়োজন হয় প্রায় ৮৪০ কোটি টাকা। ফলে প্রতি বছরই আয়ের তুলনায় ব্যয়ের ব্যবধানজনিত কারণে প্রায় ১৫৬ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আবেদন জমাকরণের স্তূপ তৈরি করছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ট্রাস্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে শিক্ষামন্ত্রী জানান, বর্তমানে ২০২৩ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় ৪৪ হাজার আবেদন সম্পূর্ণ অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার জন্য বর্তমান সরকারের এককালীন প্রায় ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন। সরকার এই বিপুল পরিমাণ অর্থের সংস্থান করতে এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত আর্থিক দাবি দ্রুত পরিশোধের লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন নীতিগত ও ব্যবহারিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং এ বিষয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
আবেদন নিষ্পত্তির চলমান অগ্রগতি সম্পর্কে সংসদকে আশ্বস্ত করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রাপ্য সুবিধা দ্রুত প্রদানের লক্ষ্যে সরকার ও কল্যাণ ট্রাস্ট সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইতিমধ্যেই ৯ হাজার ২৮৪ জন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর আবেদন অনুমোদন করা হয়েছে এবং তাদের অনুকূলে ৫৫৩ কোটি ৬৩ লাখ ৩৫ হাজার ৮৭৪ টাকা কল্যাণ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি, ২০২৩ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ট্রাস্টে জমা পড়া সকল বৈধ আবেদন সম্পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। আধুনিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়াকরণ নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ (iBAS++) পদ্ধতির মাধ্যমে এই অর্থ সরাসরি সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগীদের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। এছাড়া, ২০২৩ সালের জুন ও জুলাই মাসের মধ্যে জমাকৃত আবেদনগুলোরও যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে এবং চূড়ান্ত অর্থ পরিশোধের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। সরকার আশা করছে, অতিরিক্ত তহবিলের সংস্থান সম্পন্ন হলে অবশিষ্ট ৪৪ হাজার শিক্ষকের অপেক্ষার অবসান ঘটবে এবং ট্রাস্টের সামগ্রিক কার্যক্রমে গতিশীলতা ফিরে আসবে।