বিশেষ প্রতিবেদক
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) শাহাদাত হোসেন আজ রোববার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি গত ১২ জুন এক চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছে সংশ্লিষ্ট পক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেনজীর আহমেদকে কোন নির্দিষ্ট মামলার ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হবে কিংবা তাঁকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। তবে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে এই গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের একটি আদালত।
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের পুলিশ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তবে দায়িত্ব পালনকালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে র্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় মার্কিন প্রশাসন, যার মধ্যে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক মাস আগে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। গণমাধ্যমে তাঁর বিপুল অবৈধ সম্পদের তথ্য প্রকাশের পর তা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পরপরই তিনি সপরিবারে দেশ ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে একাধিক মামলা দায়ের করা হয় এবং দেশের আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
এর আগে, ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর পৃথক চারটি মামলা দায়ের করে দুদক। মামলার বিবরণী অনুযায়ী, সাবেক এই পুলিশ প্রধান নিজে ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। এছাড়া তাঁর স্ত্রী জীশান মীর্জা ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন বলে দুদকের তদন্তে উঠে আসে।
মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়, তাঁদের বড় মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার এবং মেজ মেয়ে তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীর ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। এর আগে ২০২৪ সালের ১২ জুন আদালতের আদেশে বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের নামে থাকা ঢাকার বাড্ডা ও আদাবরের ৮টি ফ্ল্যাট এবং নারায়ণগঞ্জ, বান্দরবান ও উত্তরায় ২৫ একর ২৭ কাঠা জমি ক্রোক করা হয়।
এছাড়া ধারাবাহিক অনুসন্ধানের পর দুই দফায় বেনজীর ও তাঁর পরিবারের নামে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে থাকা ৬২১ বিঘা জমি, ১৯টি কোম্পানির শেয়ার এবং গুলশানের ৪টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রোকের আদেশ দিয়েছিলেন দেশের আদালত। একই সাথে দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে সাবেক এই আইজিপির ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব এবং শেয়ার ব্যবসার ৩টি বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধ বা ফ্রিজ করার আদেশ দেওয়া হয়। দুবাইয়ে তাঁর এই গ্রেপ্তারের পর সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া নতুন মোড় নেবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।