আইন আদালত ডেস্ক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার ৮০৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। আজ রোববার (১৪ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় প্রকাশ করেন। প্রকাশিত এই পূর্ণাঙ্গ রায়ে ট্রাইব্যুনালের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ, আসামিদের অপরাধের ধরন এবং শাস্তি নির্ধারণের আইনি যুক্তিসহ বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে গত ৯ এপ্রিল এই মামলার সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করা হয়েছিল।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল গত এপ্রিল মাসে এই ঐতিহাসিক মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে অপরাধের ভিন্নতা ও সংশ্লিষ্টতা বিবেচনা করে দুজনকে মৃত্যুদণ্ড, তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, পাঁচজনকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, আটজনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১১ জনকে ৩ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া অপর এক আসামির হাজতবাসকালীন সময়কে তার সাজার মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য করে আদালত তাকে অব্যাহতি দেন।
পূর্ণাঙ্গ রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অপরাধে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ঘটনার সময় দায়িত্বে অবহেলা এবং অপরাধে সহযোগিতার দায়ে তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধবকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।
এই মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতা বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। সাজাপ্রাপ্ত এই আসামিরা হলেন— বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য (ভিসি) ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি পোমেল বড়ুয়া। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া ঘটনার সঙ্গে বিভিন্ন মাত্রায় সম্পৃক্ততার কারণে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, অফিস সহকারী মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি ডা. সারোয়ার হোসেন ওরফে চন্দনকে ৫ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
একই মামলায় ৩ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস, সহ-সভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডল, একেএম আমির হোসেন ওরফে আমু এবং নিরাপত্তা কর্মী নূর আলম মিয়া। অন্যদিকে, প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেল দীর্ঘদিন হাজতবাস করায় তার সেই সময়কে সাজার মেয়াদ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের মাধ্যমে দেশের বিচারিক প্রক্রিয়ায় একটি বড় মাইলফলক অর্জিত হলো। এই রায় দেশের মানবাধিকার রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে একটি দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।