খেলাধূলা ডেস্ক
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে আর্জেন্টিনার সাবেক অধিনায়ক ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার নাম অসংখ্য কীর্তি ও রেকর্ডের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা (ফিফা) আয়োজিত বিশ্বকাপ ফুটবলে তার করা গোলগুলোর একটি বিশেষ পরিসংখ্যান ফুটবল গবেষক ও বিশ্লেষকদের কাছে আজও এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক ফুটবলে বিভিন্ন স্ট্রাইকার ও ফরোয়ার্ড পেনাল্টি স্পট থেকে গোল করে নিজেদের ব্যক্তিগত গোলের সংখ্যা বৃদ্ধি করলেও ম্যারাডোনার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে। তিনি তার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে মোট ৮টি গোল করলেও এর একটিও পেনাল্টি থেকে আসেনি। সম্পূর্ণ ওপেন প্লে এবং ফ্রি-কিক থেকে আসা এই গোলগুলো মাঠের খেলায় তার কার্যকারিতা এবং ফুটবলীয় দক্ষতার গভীরতা নির্দেশ করে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আর্জেন্টিনার এই সাবেক তারকা ১৯৮২ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত টানা চারটি বিশ্বকাপ আসরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি বিশ্বমঞ্চে মোট ২১টি ম্যাচে মাঠে নামেন। ১৯৮২ সালে স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে তরুণ ম্যারাডোনা প্রথম বৈশ্বিক নজর কাড়েন। এরপর ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো, ১৯৯০ সালে ইতালি এবং সর্বশেষ ১৯৯৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে তিনি অংশ নেন। এই ২১ ম্যাচের ক্যারিয়ারে ম্যারাডোনা প্রতিপক্ষের জালে মোট আটবার বল পাঠাতে সক্ষম হন। ফুটবলীয় রেকর্ডের বিশ্লেষণে দেখা যায়, আধুনিক যুগের অনেক শীর্ষ ফুটবলার যেখানে পেনাল্টির ওপর ভর করে নিজেদের গোলের পরিসংখ্যান সমৃদ্ধ করেছেন, সেখানে ম্যারাডোনার আটটি গোলের প্রতিটিই ছিল মাঠের প্রবহমান খেলা (ওপেন প্লে) কিংবা সেটপিস বা ফ্রি-কিক থেকে সরাসরি অর্জিত।
can ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ গোলের খতিয়ান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে তিনি বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রথম গোলের খাতা খোলেন। ওই ম্যাচে তিনি জোড়া গোল করেছিলেন। এরপর তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত সময় আসে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে। আর্জেন্টিনাকে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেওয়ার পথে ম্যারাডোনা একাই ৫টি গোল করেন। এর মধ্যে গ্রুপ পর্বে ইতালির বিপক্ষে একটি, কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি এবং সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে দুটি গোল করেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা গোল দুটির মধ্যে একটি ফুটবল ইতিহাসে বিতর্কিত হলেও অন্য গোলটি ফিফা কর্তৃক শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃতি পায়, যা ছিল সম্পূর্ণ একক নৈপুণ্যে মাঝমাঠ থেকে বেশ কয়েকজন ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে পরাস্ত করে করা। এই আসরে পেনাল্টি ছাড়াই তার করা পাঁচ গোল তাকে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ এনে দেয়।
১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে নেতৃত্ব দিলেও ইনজুরি ও কড়া রক্ষণাত্মক মার্কিংয়ের কারণে টুর্নামেন্টের মূল সময়ে কোনো গোল করতে পারেননি। তবে ১৯৯৪ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে গ্রিসের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে তিনি একটি দর্শনীয় গোল করেন, যা ছিল বিশ্বকাপে তার অষ্টম এবং শেষ গোল। ম্যারাডোনার এই পেনাল্টিহীন আট গোলের রেকর্ডটি ক্রীড়া পরিমণ্ডলে এই কারণে গুরুত্ব পায় যে, ফুটবল ইতিহাসে অনেক শীর্ষ সারির খেলোয়াড়ও বড় টুর্নামেন্টে গোলের সংখ্যা বাড়াতে পেনাল্টির সহায়তা নিয়েছেন। পেনাল্টি কিক একজন খেলোয়াড়ের জন্য গোলের সহজ সুযোগ তৈরি করলেও ম্যারাডোনাকে প্রতিটি গোল করতে হয়েছে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে এবং কঠিন শারীরিক বাধা অতিক্রম করে।
ফুটবল পরিসংখ্যানবিদদের মতে, ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার নকআউট পর্বের ম্যাচগুলোতে ম্যারাডোনাকে পেনাল্টি নিতে দেখা গিয়েছিল। বিশেষ করে কোয়ার্টার ফাইনালে যুগোস্লাভিয়া এবং সেমিফাইনালে স্বাগতিক ইতালির বিপক্ষে ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ালে ম্যারাডোনা স্পট কিক নিয়েছিলেন। তবে ফিফার অফিশিয়াল নিয়ম এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল এসোসিয়েশন বোর্ডের (আইএফএবি) আইন অনুযায়ী, নকআউট বা ফাইনাল ম্যাচের টাইব্রেকারে (পেনাল্টি শ্যুটআউট) করা গোলগুলো কোনো খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত আন্তর্জাতিক গোল বা বিশ্বকাপের মূল গোল হিসেবে গণনা করা হয় না। এগুলো কেবল ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে গণ্য হয়। ফলশ্রুতিতে, টাইব্রেকারে অংশ নেওয়া সত্ত্বেও ম্যারাডোনার অফিশিয়াল বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা আট-ই রয়ে গেছে এবং তা পেনাল্টিমুক্ত হিসেবেই ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, পেনাল্টি ছাড়া বিশ্বকাপে আটটি গোল করার এই কীর্তি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য একটি ভিন্ন মানদণ্ড স্থাপন করে। আধুনিক ফুটবলে যেখানে দলগত কৌশল এবং ট্যাকটিক্যাল ফাউলের কারণে ওপেন প্লে থেকে গোল করা ক্রমান্বয়ে কঠিন হয়ে পড়ছে, সেখানে ম্যারাডোনার এই পরিসংখ্যান মাঠের খেলায় তার অতুলনীয় প্রভাবকে প্রমাণ করে। ফিফার ঐতিহাসিক ডাটাবেজ অনুযায়ী, বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় অনেকের নাম ম্যারাডোনার ওপরে থাকলেও, পেনাল্টির অবদান বাদ দিলে একক ফিল্ড গোলের দিক থেকে ম্যারাডোনার কার্যকারিতা অত্যন্ত উচ্চ স্তরের। এই পরিসংখ্যানটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই তারকার খেলার ধরন, ড্রিবলিং ক্ষমতা এবং একক দক্ষতায় ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতার একটি বস্তুনিষ্ঠ দলিল হিসেবে গণ্য হচ্ছে।