বিশেষ প্রতিবেদক
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার টেকসই উন্নয়নে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এই মহাপরিকল্পনার আওতায় আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন, দীর্ঘমেয়াদি পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই বিশাল উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনের সময় এই রূপরেখা ও বিশেষ অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও উপর্যুপরি বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। এই দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলায় সরকার পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পরিকাঠামো নির্মাণে জোর দিচ্ছে।
পরিবেশ ও বন খাতের পরিকল্পনা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে যে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে, তার একটি বড় অংশ বাস্তবায়িত হবে আগামী অর্থবছরেই। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৫ হাজার ৯শ ৬০ হেক্টর ব্লক বাগানে চার কোটি ২৮ লাখ ৯৭ হাজার চারা, তিন হাজার সাতশ ২৭ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগানে ৩৭ লাখ ২৭ হাজার চারা এবং চার হাজার হেক্টর ম্যানগ্রোভ বাগানে এক কোটি ৭৭ লাখ Tremendous চারা রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া বসতবাড়ি বনায়নের আওতায় ৫৬ লাখ এবং ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির অধীনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে আরও এক কোটি চারা রোপণ করা হবে। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনের ৫০ শতাংশকে আন্তর্জাতিক কার্বন ট্রেডিং কার্যক্রমের আওতায় এনে রাজস্ব আয়ের নতুন খাত তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
বাজেট প্রস্তাবে পরিবেশ দূষণ রোধ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরে দেশের বায়ুর মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য ১৫টি সিএএমএস (কন্টিনিউয়াস এয়ার মনিটরিং স্টেশন) এবং ১৬টি সি-সিএএমএস সচল রাখা হবে। যানবাহনের ক্ষতিকর ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে বিআরটিএর মাধ্যমে ১০টি আধুনিক ভেহিকেল ইন্সপেকশন সেন্টার স্থাপনের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাস সার্ভিস চালুর রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ‘সার্কুলার ফিউচার মডেল’ এবং ই-বর্জ্যের জন্য নতুন নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে। ‘থ্রিআর’ (রিডিউস, রিউজ, রিসাইকেল) নীতির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এই সামগ্রিক জলবায়ু কার্যক্রম টেকসই করতে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের জন্য আগামী অর্থবছরে একশ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এদিকে, দেশের সামগ্রিক পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে নদী পুনরুদ্ধার এবং খনন কাজে বড় ধরনের বিনিয়োগের কথা জানানো হয়েছে। সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, নদীভাঙন রোধ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল ও জলাধার খনন এবং পুনঃখনন করা হবে, যার মধ্যে ৬ হাজার ৫শ ৯৮ কিলোমিটার খালের কাজ বর্তমানে চলমান। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন করে তিনশ ৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ এবং চারশ ৮৪ কিলোমিটার নদ-নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচির আওতায় দেশের প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি নদী বা জলাশয় সম্পূর্ণ দখলমুক্ত ও পুনরুজ্জীবিত করার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ধলেশ্বরী, লৌহজং, আলাইকুড়ি, মগড়া, সালতাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানি প্রবাহ নিশ্চিতকরণের কাজ চলছে।
পানি সম্পদ খাতের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত উদ্যোগ হিসেবে ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদিত হয়েছে বলে বাজেট বক্তৃতায় জানানো হয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে আগামী সাত বছরে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এর ফলে দেশের চারটি বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলার প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি সুফল পাবেন। পাশাপাশি, দেশের উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফলভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০ হাজার পাঁচশ ৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক পরিবেশগত নিরাপত্তা ও টেকসই অর্থনীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।