অর্থনীতি প্রতিবেদক
সরকারি ও বেসরকারি নাগরিক সেবা গ্রহণকে আরও সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর করতে দেশে ‘ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ (ডিপিআই) এবং ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সম্পূর্ণ ক্যাশলেস বা নগদ টাকাবিহীন ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে এ সংক্রান্ত কার্যক্রম দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই নতুন পরিকল্পনার কথা জানান।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, নাগরিক জীবনে ডিজিটাল সেবার পরিধি বৃদ্ধি এবং এটিকে নিরাপদ করার পাশাপাশি সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত এই সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের একক পরিচয় এবং ডিজিটাল ওয়ালেট নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যা আর্থিক লেনদেন ও সরকারি ভাতা বা সেবা প্রাপ্তিতে আমূল পরিবর্তন আনবে। এর ফলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের প্রযুক্তি খাতের টেকসই উন্নয়নে সেমিকন্ডাক্টর (মাইক্রোচিপ) প্রযুক্তির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে এবারের বাজেটে। অর্থমন্ত্রী জানান, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেশে এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তিবিদ, গবেষক ও উদ্যোক্তাদের যৌথভাবে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক বাজারে সেমিকন্ডাক্টরের ক্রমবর্ধমান চাহিদার যুগে বাংলাদেশ যদি এই খাতে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করতে পারে, তবে তা দেশের রপ্তানি আয়ে নতুন মাত্রা যোগ করবে। একই সঙ্গে এটি দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য উচ্চমানের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশকে বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদনকারী কেন্দ্র (গ্লোবাল ইলেকট্রনিকস ম্যানুফ্যাকচারিং হাব) হিসেবে রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে সরকার। এই লক্ষ্য অর্জনে একটি দূরদর্শী ও সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন, উপযুক্ত নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রণোদনা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই মহাপরিকল্পনা কেবল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং বেসরকারি খাতের অন্যান্য অংশীজনদের সরাসরি সম্পৃক্ত করে বাস্তবায়ন করা হবে বলে অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই প্রযুক্তি-বান্ধব বাজেট প্রস্তাবনা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে আধুনিকায়নের দিকে নিয়ে যাবে। ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ এর মতো উদ্যোগ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবার আওতায় আনতে (ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন) কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
অন্যদিকে, নিজস্ব প্রযুক্তিতে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন এবং ইলেকট্রনিকস খাতের বিকাশ ঘটানো সম্ভব হলে আমদানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট নীতিপ্রণেতারা।