জাতীয় ডেস্ক
রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া লিখিত জবাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। হাসপাতালটির পাঠানো ব্যাখ্যাকে ‘অস্পষ্ট’ ও ‘অপ্রাসঙ্গিক’ আখ্যায়িত করে তিনি জানিয়েছেন, এই বিষয়ে পর্যালোচনা শেষে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আজ বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে জবাব পাঠিয়েছে, তা বিশদভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখানে মূল বিষয়ের বাইরে অপ্রাসঙ্গিক অনেক বিষয় অবতারণা করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের পক্ষ থেকে যে সুনির্দিষ্ট তথ্য চাওয়া হয়েছিল, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই জবাবের ওপর ভিত্তি করে আজ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পরবর্তী আইনানুগ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে।
গত ২৭ মে ভোরে আদ-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা ছয়টি নবজাতক মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মারা যায়। এই ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি নিবিড় অনুসন্ধান শেষে হাসপাতালের সার্বিক চিকিৎসাব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনায় ভয়াবহ ত্রুটি চিহ্নিত করে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে নবজাতকদের রাখা হয়েছিল, সেটি সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত ছিল। ওয়ার্ডটিতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের কোনো সুব্যবস্থা ছিল না। এমনকি সেখানে থাকা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) ছিল অত্যন্ত অপ্রতুল এবং তা নিয়মিত চালানো হতো না, যা নবজাতকদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেছিল।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, ঘটনার সময় ওই সংবেদনশীল ওয়ার্ডে কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। নবজাতকদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করলেও কর্তব্যরত নার্স বা কর্মীরা সময়মতো চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পারেননি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জন্মের পর প্রতিটি নবজাতকের শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক ও সুস্থ ছিল। তাদের বিশেষ কোনো চিকিৎসা কিংবা ইনকিউবেটরের প্রয়োজন ছিল না। মূলত হঠাৎ পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে চরম গাফিলতি, কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এবং নিবিড় তত্ত্বাবধানের অভাবেই এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
এই তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে গত ৪ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসানের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
আজ স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, শোকজের জবাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চার থেকে পাঁচ পৃষ্ঠার দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিলেও তা কেবলই দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা। মূল ঘটনার বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো সদুত্তর তারা দিতে পারেনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটির সুপারিশ এবং হাসপাতালের অস্পষ্ট জবাবের প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিল, জরিমানা কিংবা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পথ উন্মুক্ত রয়েছে। আজকের বৈঠকের পরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে।