নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আগামী তিন মাসের মধ্যে কার্যকর করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। দ্রুততম সময়ে বিচারিক আদালতের রায় ঘোষণার পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এই তথ্য জানান তিনি।
রবিবার (৭ জুন) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনমন্ত্রী বলেন, মাত্র ছয় কার্যদিবসের মধ্যে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মামলার রায় দেওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতের আইনি প্রক্রিয়াগুলো যথানিয়মে শেষ করা গেলে তিন মাসের মধ্যেই চূড়ান্ত রায় কার্যকর করা সম্ভব। আইনে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া না থাকলেও প্রতিটি আইনি ধাপ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করেই এই মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। বিচারিক আদালতের এই রায়ে সরকার সন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং উচ্চ আদালতেও এই সাজা বহাল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আইনমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, তাড়াহুড়ো করে আইনি ধাপগুলো এড়িয়ে রায় কার্যকর করা হলে তা নিয়ে আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন ওঠার সুযোগ থাকে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পাবেন এবং সেখানেও নিয়ম মাফিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, রায় ঘোষণার সাত দিনের মধ্যে মামলার যাবতীয় নথি ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) নিশ্চিতকরণের জন্য হাইকোর্ট বিভাগে পাঠানো হবে। এরপর সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেপার বুক প্রস্তুত করে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী শুনানি শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এর আগে আজ রবিবার সকালে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আদালতে হাজির করা হয়। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে স্বপ্না আক্তারকে এবং সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে প্রিজনভ্যানে করে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে আনা হয়। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই আদালত পাড়ায় অতিরিক্ত পুলিশ ও কঠোর নিরাপত্তা নজরদারি মোতায়েন করা হয়।
গত ৪ জুন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের জন্য ৭ জুন দিন ধার্য করেছিলেন। মাত্র চার কার্যদিবসের মধ্যে সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্কসহ মূল বিচারিক কাজ সম্পন্ন হয়। এর আগে গত ১ জুন মামলার আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল। পরদিন ২ জুন মামলার মোট ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন করে আদালত। ৩ জুন কার্যবিধির ৩৪২ ধারা অনুযায়ী আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হলে তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন।
আজ ঘোষিত রায়ে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। একই সঙ্গে আদালত সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ টাকা এবং স্বপ্না আক্তারকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার আদেশ দেন। আসামিদের সম্পত্তি বিক্রি করে এই জরিমানার অর্থ ভুক্তভোগী রামিসার পরিবারকে প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলার এজাহার ও বিবরণী থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে সকালে মিরপুরের পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তার নিজ বাসা থেকে বের হয়। পূর্বপরিকল্পনা ও কৌশলের অংশ হিসেবে প্রতিবেশী স্বপ্না আক্তার শিশুটিকে ডেকে তাদের বাসায় নিয়ে যায়। এরপর প্রধান আসামি সোহেল রানা শিশুটিকে ধর্ষণ করে এবং পরবর্তীতে স্বামী-স্ত্রী মিলে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে মরদেহ গুম করার চেষ্টা চালায়। ঘটনার পরদিন পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হলে পুলিশ দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই রায় দেশের বিচারিক ইতিহাসে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে একটি দৃষ্টান্তমূলক মাইলফলক হিসেবে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞরা।