আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের কেরালা রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন ফাতিমা তাহিলিয়া। ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের (আইইউএমএল) ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন। রাজ্যের পেরাম্ব্রা আসনে লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (এলডিএফ) প্রভাবশালী প্রার্থী এবং বর্ষীয়ান বাম নেতা টিপি রামকৃষ্ণনকে ৫ হাজার ৮৭ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে এই বিজয় ছিনিয়ে নেন তিনি। পেশায় আইনজীবী ফাতিমা তাহিলিয়ার এই সাফল্য দলটির দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কেরালার রাজনীতিতে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ একটি প্রভাবশালী শক্তি হলেও বিধানসভা নির্বাচনে নারীদের মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলটির ইতিহাস বেশ সীমাবদ্ধ। ফাতিমা তাহিলিয়ার আগে ১৯৯৬ সালে ভানিতা লীগের নেত্রী কামারুন্নিসা আনোয়ার এবং ২০২১ সালে নূরবিনা রশিদকে কোঝিকোড কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। তবে তাদের কেউই জয়ের মুখ দেখতে পাননি। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালে কামারুন্নিসা আনোয়ারের পরাজয়ের পর পরবর্তী ২৫ বছর দলটি কোনো নারীকে বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী করেনি। এই দীর্ঘ বিরতি এবং কট্টর অবস্থানের কারণে আইইউএমএল প্রায়শই রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেরালার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত হওয়ার পর থেকে তৃণমূল রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সামাজিক পরিবর্তনের ঢেউ স্পর্শ করেছে আইইউএমএলকেও। বিশেষ করে রাজ্য সভাপতি সৈয়দ সাদিকালী শিহাব থাঙ্গালের নেতৃত্বে দলটির দৃষ্টিভঙ্গিতে উদারতার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় এবার প্রথমবারের মতো দুজন নারীকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয় আইইউএমএল। বিশ্লেষকদের মতে, দলের নেতৃত্বের এই ইতিবাচক পরিবর্তনই ফাতিমা তাহিলিয়ার মতো তরুণ ও যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচনী ময়দানে লড়াই করার সুযোগ করে দিয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় ফাতিমা তাহিলিয়ার প্রাণবন্ত উপস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের সাথে সহজ যোগাযোগের কৌশল ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী টিপি রামকৃষ্ণন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) বা সিপিআই(এম)-এর একজন অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী নেতা হওয়া সত্ত্বেও তরুণ ভোটার এবং নারী সমাজের সমর্থন ফাতিমার পক্ষে জনমত গঠনে বড় ভূমিকা পালন করেছে। এই বিজয় আইইউএমএল-এর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নূরবিনা রশিদের মতো জ্যেষ্ঠ নেতাদের পূর্বতন বিরোধিতাকেও অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফাতিমা তাহিলিয়ার এই জয় শুধু একজন ব্যক্তির বিজয় নয়, বরং এটি ভারতের মুসলিম প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর জেন্ডার রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে দলটির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, তারা নারীদের শুধুমাত্র নামমাত্র বা কঠিন আসনগুলোতে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করায়। কিন্তু পেরাম্ব্রার মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনে ফাতিমার জয় প্রমাণ করেছে যে, যোগ্য নারী নেতৃত্ব জনসমর্থন পেলে জয়ী হতে সক্ষম। এই ফলাফল ভবিষ্যতে কেরালার রাজনীতিতে মুসলিম নারীদের আরও বৃহত্তর পরিসরে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পথ প্রশস্ত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।