আইন আদালত ডেস্ক
জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার (লিগ্যাল এইড) মাধ্যমে দেশের ১৪ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৬ জন অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীকে সরকারি খরচে আইনি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও বিচার লাভে অসমর্থ নাগরিকদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের এই কার্যক্রমের পরিধি গত দেড় দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিশাল সংখ্যক সেবাগ্রহীতার মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনে দেখা গেছে যে, পুরুষদের পাশাপাশি নারী ও শিশুদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। মোট সুবিধাভোগীদের মধ্যে পুরুষ ৭ লাখ ৪ হাজার ৮৬৫ জন এবং নারী ৬ লাখ ৫৭ হাজার ৩৩৪ জন। এ ছাড়াও ৭৫ হাজার ৪৬৩ জন শিশু এবং তৃতীয় লিঙ্গের ৭৪ জন ব্যক্তি এই সরকারি আইনি সহায়তা গ্রহণ করেছেন। মূলত আইনি লড়াইয়ে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার পৌঁছে দিতেই এই উদ্যোগটি বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্যে দেখা যায়, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট ৪ লাখ ৬২ হাজার ৬৪৩টি মামলায় লিগ্যাল এইড বিচারপ্রার্থীদের সরাসরি সহায়তা প্রদান করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় বিভিন্ন স্তরে এই সেবা বিভক্ত ছিল। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে ৩০ হাজার ৪৭৪ জন উচ্চ আদালতে আইনি লড়াইয়ের সুযোগ পেয়েছেন। অন্যদিকে, দেশের ৬৪টি জেলায় বিস্তৃত জেলা লিগ্যাল এইড অফিসগুলোর মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অর্থাৎ ১১ লাখ ৭৫ হাজার ৬৪৪ জন বিচারপ্রার্থী সেবা গ্রহণ করেছেন।
শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পরিচালিত শ্রমিক আইনি সহায়তা সেলের মাধ্যমে সেবা পেয়েছেন ৩০ হাজার ৪১ জন। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বিচারপ্রার্থীদের তাৎক্ষণিক পরামর্শ দিতে চালু করা হয়েছে টোল-ফ্রি জাতীয় হেল্পলাইন কল সেন্টার। এই কল সেন্টারের মাধ্যমে ২ লাখ ১৫ হাজার ৭৭ জন নাগরিক সরাসরি আইনি পরামর্শ ও তথ্য সেবা গ্রহণ করেছেন।
উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে ২০০০ সালে ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন’ প্রণীত হওয়ার মাধ্যমে সরকারি খরচে আইনি সহায়তা দেওয়ার পথ সুগম হয়। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা এই কার্যক্রমগুলো পরিচালনা ও তদারকি করে থাকে। মূলত যারা অর্থাভাবে আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন না বা মামলার খরচ চালাতে অক্ষম, তাদের আইনি পরামর্শ প্রদান, আইনজীবী নিয়োগ এবং মধ্যস্থতার (এডিআর) মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তিতে এই সংস্থাটি কাজ করে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি এই সহায়তার পরিসর বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বিচার ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার যেমন বাড়ছে, তেমনি আদালতে মামলার জট কমাতেও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। মাঠ পর্যায়ে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসগুলোর সক্রিয়তা এবং প্রচারণার ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। ভবিষ্যতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই সেবা তৃণমূল পর্যায়ে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।